দার্জিলিংয়ে গুরংপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলি, এক পুলিশ নিহত

পরিতোষ পাল
2017.10.13
কলকাতা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং পন্থীদের গুলিতে নিহত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিকের মরদেহে ভারতীয় পুলিশের শ্রদ্ধা নিবেদন। দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং পন্থীদের গুলিতে নিহত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিকের মরদেহে ভারতীয় পুলিশের শ্রদ্ধা নিবেদন। শিলিগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ১৩ অক্টোবর ২০১৭।
AFP

ষোলো দিন শান্ত থাকার পর শুক্রবার দার্জিলিং পাহাড়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুংপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলিতে এক পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও চার পুলিশ কর্মী।

নিহত সাব ইন্সপেক্টর হলেন অমিতাভ মালিক। শুক্রবার দুপুরে নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এডিজি আইনশৃঙ্খলা অনুজ শর্মা এই খবর জানান। মোর্চার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে তাদের এক সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মোর্চা সভাপতি বিমল গুরুং তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে পাতলেবাসের কাছেই লুকিয়ে রয়েছেন খবর পাওয়ার পরই পুলিশ তাঁকে ধরতে লিম্বু বস্তিতে অভিযান চালায়। তবে গুরুংকে পালাতে দেবার জন্য তাঁর অনুগামীরা পুলিশের উপর গুলি চালায়। পুলিশ সেখানে একটি অস্ত্র কারখানার হদিশ পেয়েছে । সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৬টি এ কে ৪৭, একটি নাইন এমএম পিস্তল, ৫০০ কার্তুজ এবং বিস্ফোরক তৈরির মশলা।

গত আগস্টে বিমল গুরুংসহ মোর্চার শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্টে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ৮ জুন ভানু ভবনে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন অশান্তি সংগঠিত করার অভিযোগে গুরুংয়ের বিরুদ্ধে গত সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এর আগে থেকেই অবশ্য গুরুং আত্মগোপনে রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার বিমল গুরুং স্থানীয় সাংবাদিকদের এক অডিও বার্তায় জানান, “৩০ অক্টোবর আমি জনতার সামনে আসব। জনতা আমাকে ডাকছে। জনতা ডাকলে আসতে হবে। জনতার জন্য আমি মরতে রাজি আছি।”

“গুরুংয়ের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। যে করেই হোক তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশ জানতে পেরেছে, পুলিশের ওপর এদিন হামলার নির্দেশ দলীয় কর্মীদের দিয়েছিলেন গুরুং,” বলেন অনুজ শর্মা।

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর ও ৭ অক্টোবর সিআইডির বিশেষ টিম সিকিম রাজ্যের নামচিতে বিমল গুরংয়ের গোপন ডেরায় অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু অল্পের জন্য পুলিশ তাঁকে ধরতে পারেনি বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।

বাড়িতে টাঙানো ছবিতে সাব ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিক। ১৩ অক্টোবর ২0১৭।
বাড়িতে টাঙানো ছবিতে সাব ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিক। ১৩ অক্টোবর ২0১৭।
বেনার নিউজ

মাওবাদী ও উত্তর পূর্ব ভারতের জঙ্গি যোগ

অনুজ শর্মা অভিযোগ করেন, “মাওবাদী ও উত্তর–পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে গুরুংয়ের যোগযোগ রয়েছে। সেখান থেকেই অস্ত্র এবং অর্থ জোগাড় করছেন। পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রশাসন বেশ কিছুদিন ধরেই এই একই অভিযোগ জানিয়ে আসছিল।”

“এদিন দার্জিলিংয়ে যে ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক পাওয়া গেছে তাতে স্পষ্ট যে, মাওবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যোগ রয়েছে বিমল গুরুংয়ের,” বেনারকে বলেন রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব।

গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসনিক বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মোর্চার বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নেতা বিনয় তামাং শুক্রবার কলকাতা বিমানবন্দরে বেনারকে বলেন, “পাহাড়ে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক। আর এদিন যে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে মাওবাদীদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যোগ রয়েছে।”

“এ সবের দায় নিতে হবে বিমল গুরুংকেই,” বলেন বিনয় তামাং।

পাহাড়ে ১০৪ দিন ধরে টানা বন্ধ চলার পর তা গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা তুলে নেওয়া হয়।

গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতৃত্বে আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে এই বন্ধ চলছিল। টানা বন্ধ যে আর পাহাড়ে হবে না সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পাহাড়ের মানুষকে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নেতা বিনয়

“পাহাড়ে এতদিন বনধ করে কোনও লাভই হয় নি। বরং সাধারণ মানুষের ক্ষতিই হয়েছে,” বেনারকে বলেন কালিম্পংয়ের বাসিন্দা নীরজ প্রধান।

তাঁর মতে, “আলোচনার পথেই গোর্খাল্যান্ডের দাবি আদায়ে সকলকে একমত হতে হবে।”

মোর্চার নেতৃত্ব বিক্ষুব্ধদের হাতে

আন্দোলনের প্রশ্নে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতৃত্ব এখন বিক্ষুব্ধদের দখলে চলে আসায় মোর্চা সভাপতি বিমল গুরুং মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমর্থনে বিনয় তামাং ও অনীত থাপারা জিটিএ-র প্রশাসনিক বোর্ডের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করে দেওয়ার পর মোর্চার অধিকাংশ নেতাই বিনয় তামাংদের সমর্থন জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে দার্জিলিং মিউনিসিপ্যালটির ২২ জন এবং কার্শিয়াং মিউনিসিপ্যালটির ১৭ জন কাউন্সিলর লিখিতভাবে বিনয় তামাংদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। এমনকি ভারত সরকারও বিনয় তামাংকে এখন গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে। গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা বিজেপির নেতা কৈলাস বিজয় বর্গীয় বলেন, বিনয় তামাং আলোচনায় যোগ দিলে আমাদের আপত্তি কীসে?

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক বিনয় তামাংয়ের

পাহাড়ের উন্নয়ন নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় নবান্নে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসনিক বোর্ডের চেয়ারম্যান বিনয় তামাং।

পাহাড়ে কীভাবে উন্নয়ন করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গেছে। জিটিএ চেয়ারম্যান হওয়ার পর এই প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন বিনয় তামাং।

মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য ধাপে ধাপে ৫০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করবেন বলে জানিয়েছেন। এদিনের পাহাড়ের ঘটনা নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিনয় তামাং।

বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পাহাড়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ অনুদান এবং বাড়তি নিরাপত্তা প্রয়োজন বলে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন।

শনিবার বিনয় তামাং রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠির সঙ্গেও দেখা করবেন।

এছাড়া ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে একটি কমিটিও তৈরি করেছে। এই কমিটিই সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বৈঠকের দিন তারিখ ঠিক করবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে।

এর আগে রাজ্য সরকার পাহাড়ের দলগুলির সঙ্গে দুই দফায় বৈঠক করেন। সেই দুটি বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও পাহাড়ে শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সকলে একমত হয়েছিলেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।