Follow us

বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া ও মাদকাসক্তি পরীক্ষা করতে আদালতের রুল

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-11-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশি একটি বিয়ের আসরে বর ও কনে। ১১ নভেম্বর ২০১১।
বাংলাদেশি একটি বিয়ের আসরে বর ও কনে। ১১ নভেম্বর ২০১১।
এএফপি

বর-কনের রক্তে থ্যালাসেমিয়া ও মাদকের অস্তিত্ব আছে কি না, বিয়ের আগে তা পরীক্ষা করে কেন নিকাহ নামায় যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত।

এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানির পর সোমবার এ রুল জারি করেছে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

পাশাপাশি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে ডোপ টেস্ট (ডাক্তারি সার্টিফিকেট) কেন বাধ্যতামূলক করা হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে।

চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, সাধারণত কোনো রুলের জবাব না দিলে আদালত বিবাদীকে তলব করতে পারে। অথবা আদালত অবমাননা করার রুলও দিতে পারে।

“রক্তে থ্যালাসেমিয়া বা মাদকের অস্তিত্ব আছে কি না, বিয়ের আগে তা পরীক্ষা এবং চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আদালত রুল জারি করেছে,” বেনারকে বলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে আদালতে শুনানিতে অংশ নেন।

উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তি মাদক কিংবা অননুমোদিত ওষুধ গ্রহণ করছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে ‘ডোপ টেস্ট’ করা হয়। পরীক্ষার ফল ‘পজিটিভ’ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই ধরনের কিছু গ্রহণ করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। থ্যালাসেমিয়ার রোগিরা সাধারণত রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতায় ভোগেন। এক বা দুই বছর বয়সের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা না করালে শিশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে।

এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের নজরে আনা ও এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়াকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোঅর্ডিনেশন সাপোর্ট সেলের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আফসানা আলমগীর খান বেনারকে বলেন, “বাবা বা মা যে কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাচ্চা হওয়ার পরে ছোটবেলা থেকেই খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। শেষ অবধি মারাও যায়।”

তিনি বলেন, “থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা আছে। যা ব্যয়বহুল। তাই প্রথম দিক থেকে জানতে পারলে সন্তান নেওয়ার আগে তাদের একটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ভ্রূণ থাকা অবস্থায় দেখে নিতে হবে বাচ্চার মধ্যে নেগেটিভ কোনো কিছু আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে বাচ্চটা ‘অ্যাবর্ট’ করে পরবর্তীতে আবার বাচ্চা নিতে পারবে তারা।”

অথবা দুই পরিবারের সম্মতিতে অনেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসতে পারেন বলেও মনে করেন তিনি।

ডাক্তার আফসানা বলেন, “তাই এ বিষয়ে যদি আদালতের কঠোর নির্দেশনা থাকে তাহলে দুটো মানুষ বাঁচবে না, পুরো পরিবার বাঁচবে। পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্য বাড়বে। থ্যালাসেমিয়া রোগ কমে আসবে।”

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এখলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া। থ্যালাসেমিয়া এবং মাদকাসক্তির প্রবণতা কমিয়ে আনতে এই ধরনের বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বেনারকে বলেন, “সংবিধানের ২১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অর্থাৎ নাগরিকের জান-মালের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। কিন্তু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে সে সুরক্ষা আমরা পাচ্ছি না।”

সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, “প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মায়। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি নারী-পুরুষ নিজের অজান্তে এ রোগের বাহক। আর তাদের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।”

“এটি একটি বংশগত রোগ। কেউ এ রোগের বাহক কিনা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা আগেই জানার সুযোগ আছে। আর একটি কথা প্রচলিত যে, এ রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম,” বলেন আইনজীবী এখলাছ উদ্দিন।

তাঁর মতে, আগামী প্রজন্মকে রক্ষার জন্য বিয়ের আগেই তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কেননা একবার রোগী হয়ে জন্ম নিলে আজীবন ভুগতে হতে পারে। শুধু রোগী নয়, রোগীর পরিবারকেও অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়।”

ডোপ টেস্টের বিষয়ে এখলাছ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “দেশের প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। যাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ ভাগ বয়সে তরুণ। তাছাড়া মাদকাসক্তি বর্তমানে দাম্পত্য কলহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ বলেও বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।”

“চাকরির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট হলে সামাজিকভাবে মাদকাসক্তি অনেকাংশে কমে আসবে,” বলেন তিনি।

গত ৫ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা শাহীন আরা লাইলী বিয়ের আগে বর ও কনের রক্তে থ্যালাসেমিয়া ও মাদকের অস্তিত্ব আছে কি না তা পরীক্ষা করে মেডিকেল সার্টিফিকেট নিকাহ নামায় যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করেন।

পরে রিটকারী পক্ষ চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে ডোপ টেস্ট সার্টিফিকেট দাখিলের বিধান চাকরি বিধিতে যুক্ত করতে চেয়ে সম্পূরক আবেদন করে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন