Follow us

হলি আর্টিজান হামলার এক বছর

প্রাপ্তি রহমান ও কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-06-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশি সেনা সদস্যরা জাতীয় পতাকায় ঢেকে দিচ্ছেন জঙ্গি হামলায় নিহতদের কফিন। ৪ জুলাই ২০১৬।
বাংলাদেশি সেনা সদস্যরা জাতীয় পতাকায় ঢেকে দিচ্ছেন জঙ্গি হামলায় নিহতদের কফিন। ৪ জুলাই ২০১৬।
AFP

রাজধানীর অভিজাত এলাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে বেছে বেছে অমুসলিম ও বিদেশি হত্যার এক বছর পরও তদন্ত শেষ করে উঠতে পারেনি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনার আকস্মিকতায় ভীত ও হতবিহ্বল মানুষগুলো এখনো ভয়ার্ত ও শোকগ্রস্ত।

গত বছরের ১ জুলাই রাতে শুরু হওয়া ওই হামলায় ১৮জন বিদেশিসহ মোট ২৪জন নিহত হন। এর দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিবৃতি দেয়। পরদিন সকালে আর্মির কমান্ডো বাহিনীর অভিযানে পাঁচ হামলাকারীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জিম্মিদশার অবসান হয়।

এই ঘটনায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশেও আইএসের উপস্থিতির বিষয়টি আলোচনায় আসে, যদিও সরকার বরাবরই সুন্নি মুসলিম প্রধান ১৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।

“হলি আর্টিজানের হামলা কীভাবে আমাদের জীবনটাকে বদলে দিয়েছে কেউ বুঝবে না,” শারমিন করিম বলছিলেন।

শারমিন সপরিবারে সে রাতে ক্যাফেতে গিয়েছিলেন রাতের খাবার খেতে। হঠাৎ কালো পোশাক পরে হামলাকারীরা ক্যাফের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ‘আল্লাহু আকবর’ (আল্লাহ মহান) বলে চিৎকার করে ওঠে।

“আমরা বাচ্চাদের নিয়ে গিয়েছিলাম জন্মদিনের অনুষ্ঠান করতে। ওরা আর কখনো বাইরে খেতে যেতে চায়নি। এমনকি তারা আর কখনো কেনাকাটা করতেও বাইরে যেতে চায় না। তারা এখনো মারাত্মক ভয়ের মধ্যে আছে,” বেনারনিউজকে বলেন শারমিন করিম।

১০ ঘণ্টার সেই শ্বাসরুদ্ধকর ও নারকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর, শারমিন করিমের স্বামী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক হাসনাত করিমকে জঙ্গিদের সহযোগিতা করার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার চার ব্যক্তির একজন এই হাসনাত করিম। তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কাউন্টার টেররিজম প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “তদন্ত প্রায় শেষের পথে। আশা করছি এ বছরের শেষ দিকে চার্জশিট দেয়া যাবে।”

পুলিশের সূত্রমতে ওই হামলায় কমপক্ষে ২২ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন এখনো পলাতক। ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

জিম্মিদশার মধ্যেই সে রাতে যাঁরা হামলার শিকার হয়েছিলেন তাঁদের বীভৎস ছবি আইএসের মুখপত্র ‘আমাক নিউজে’ প্রকাশ হয়। নিহতদের হত্যা করা হয়েছিল কুপিয়ে ও গুলি করে। ছবিগুলো ক্যাফের ভেতর থেকেই পাঠায় হামলাকারীরা।

এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বাইরেও যে বিষয়টি দেশের মানুষকে বিস্মিত করেছে তা হলো, হামলাকারী পাঁচজনের তিনজনই অবস্থাপন্ন পরিবারের সদস্য এবং দেশের সবচেয়ে ভালো স্কুল–কলেজ থেকে আসা।

এই তরুণেরা হামলার বেশ কয়েক মাস আগে থেকে নিখোঁজ ছিল। হাসনাত করিমের মুঠোফোন থেকে হামলার ছবিগুলো পাঠানো হয়েছিল বলে জানাচ্ছে পুলিশ।

কাউন্টার টেররিজম কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশে কঠোর শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা ও ভারত ও মিয়ানমারে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ওই হামলাটি চালানো হয়।

পুলিশ বলছে, গুলশান হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনা করা হয় গত বছরের মে মাসে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছিল। তবে এই হামলার ব্যাপকতা যে এমন হবে সে সম্পর্কে তাঁদের জানা ছিল না।

ঢাকায় অন্য একটি জায়গায় নতুন করে চালু হয়েছে হলি আর্টিজান বেকারি। ২২ জুন ২০১৭। [AFP]
ঢাকায় অন্য একটি জায়গায় নতুন করে চালু হয়েছে হলি আর্টিজান বেকারি। ২২ জুন ২০১৭। AFP

অভিযানে নিহত ৭০

ক্যাফেতে হামলার পর এখন পর্যন্ত জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) কমপক্ষে ৭০ জন নেতা–কর্মী র‍্যাব–পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই জঙ্গি সংগঠনটিই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছিল।

কিন্তু কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাঁরা মনে করেন তরুণদের জন্য কার্যকর ডি র‌্যাডিকালাইজেশন কর্মসূচি প্রয়োজন।

নজরুল ইসলামের ছেলে নিবরাস ইসলাম ছিলেন হামলাকারীদের একজন। নজরুল বলছিলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রচারে অংশ নিতে চান।

“আমরা এখন এক রকম একঘরে হয়ে আছি। সন্তান হারানোর কষ্ট অসহনীয়, কিন্তু জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সন্তান হারানো অপমানজনক। আমি মানুষকে বলতে চাই কীভাবে আমার ছেলে আমাদের ফেলে জিহাদের নামে ভুল পথে হেঁটেছিল,” নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন।

“যে তরুণেরা এখনো তাদের বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে, তাদের বোঝা উচিত আমরা কতটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি,” বলেন নজরুল।

“অভিভাবকেরা জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে জঙ্গিবাদের কুফল সম্পর্কে বলবেন। আমরা মনে করি তাঁদের কথা এই বার্তা দেবে যে জঙ্গিবাদ সত্যিকারের ইসলাম নয়,” কাউন্টার টেররিজম প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন।

“পুলিশি অভিযানে নিহত ও গ্রেপ্তার জঙ্গিদের অভিভাবকেরাও প্রচারে অংশ নিয়ে বলবেন সামাজিকভাবে তারা কীভাবে ভুগছেন। তাঁরা ছেলেমেয়েদের মধ্যে জঙ্গিবাদে জড়ানোর লক্ষণগুলো সম্পর্কেও বলতে পারবেন,” কাউন্টার টেররিজম কর্মকর্তা বলেন।

এই হামলার আগে থেকেই জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতায় বাংলাদেশ বদলে যেতে শুরু করে। ২০১৩ সাল থেকে কমপক্ষে ১০ জন মুক্তমনা ব্লগার, অধিকারকর্মী ও লেখক খুন হন। আরও অনেকে হত্যার হুমকি মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ

পুলিশি তদন্তে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিশেষ করে আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে।

এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীকে আইএসের কমপক্ষে দুটি সংবাদমাধ্যম দাবিক ও রুমিয়ায় ‘বাংলার খলিফা’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই কানাডীয় নাগরিক ২০১২-১৩ সালে সিরিয়ায় যান এবং ২০১৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে আসেন।

“যেসব জায়গায় বহু বছর ধরে উগ্র মৌলবাদীদের উপস্থিতি আছে বলে ধারণা করা হয়, সেসব জায়গায় তামিম চৌধুরী গেছে। চট্টগ্রাম, সিলেট এবং নব্য জেএমবির উত্তরাঞ্চলীয় বেশ কটি ঘাঁটি সে পরিদর্শন করেছে,” পুলিশ সদর দপ্তরের কাউন্টার টেররিজম ফোকাল পয়েন্ট মনিরুজ্জামান বেনারনিউজকে বলেন।

তিনি বলেন, নব্য জেএমবি হচ্ছে জেএমবিরই একটি অংশ এবং এই অংশটি আইএসের মতাদর্শ অনুসারী।

পুলিশের একটি সূত্র বেনার নিউজকে বলছে, তারা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক তাজউদ্দিন আবু কায়সারকে খুঁজছে। ধারণা করা হচ্ছে, আইএসের সঙ্গে তামিম চৌধুরীর যোগাযোগের সূত্র হিসেবে কাজ করেছেন এই তাজউদ্দিন। তিনি ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যান। পুলিশের ধারণা, তাজউদ্দিন আবু কায়সার এখনো সিরিয়ায় অবস্থান করছে।

ঘটনার তদন্তে যুক্ত কমপক্ষে দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারনিউজকে বলেন, বিদেশিদের যাতায়াত আছে এমন একটা জায়গা হামলার জন্য ঠিক করার ব্যাপারেও তাজউদ্দিন আবু কায়সার ও তামিম চৌধুরীর আলোচনা হয়।

হামলার টাকা দুবাই ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে বলে জানান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার সানোয়ার হোসেন।

“অভিযানটি খুব ব্যয়বহুল ছিল না, তবু এ কাজের অর্থ দুবাই ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে” সানোয়ার হোসেন বলেন। তিনি আরও জানান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও নব্য জেএমবির বাশারুজ্জামান চকলেট ওই অর্থ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশি চিকিৎসক খন্দকার রোকনুদ্দীন নব্য জেএমবিকে ৮০ লাখ টাকা (৯৭ হাজার মার্কিন ডলার) দিয়ে যান বলেও উল্লেখ করেন সানোয়ার হোসেন।

তবে পুলিশ বলছে, ওই হামলায় খরচ হয়েছে আট লাখ টাকা (১০ হাজার ডলার)।

“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিগোষ্ঠীটির নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে ফেলেছে। দু এক বছর পর বাংলাদেশে জেএমবি বলে আর কিছু থাকবে না,” কাউন্টার টেররিজম প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন।

তিনি আরও বলেন, “কিন্তু কার্যকর ডির‌্যাডিকালাইজেশন কর্মসূচি না থাকলে হয়তো জেএমবি নতুন নামে আবারও সক্রিয় হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন