Follow us

হলি আর্টিজান হামলা দেশের জন্য এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-06-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর সচিবালয় কার্যালয়ে বেনারনিউজের সঙ্গে কথা বলছেন। ২৯ জুন ২০১৭।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর সচিবালয় কার্যালয়ে বেনারনিউজের সঙ্গে কথা বলছেন। ২৯ জুন ২০১৭।
কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ

ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরবর্তী সময়ে টানা জঙ্গিবিরোধী অভিযান সত্ত্বেও দেশ এখনো জঙ্গি আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ না হলেও “আমরা মনে করি আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারব,” বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

দেশে এর আগে মুক্তমনা লেখক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের ঘটনা ঘটলেও বেনারনিউজের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে হলি আর্টিজান ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন “এত বড় হত্যাকাণ্ড আমাদের দেশে আর আগে কখনো হয়নি।”

গত বছর ১ জুলাই রাতের ওই ঘটনায় পাঁচ আক্রমণকারীসহ নিহতের সংখ্যা ২৯। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অপারেশনে ওই পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়।

হামলা চলাকালীন ওই আক্রমণের দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস), তাদের গণমাধ্যমে হলি আর্টিজেনের ভেতরে থাকা মৃতদেহের ছবিও প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সব সময় দেশে আইএস এর উপস্থিতি অস্বীকার করলেও বাংলাদেশে জঙ্গি হামলায় “বাইরে থেকেও কিছু ইন্ধন ছিল” বলে স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে সমর্থন দিয়েছে। এ সব সিদ্ধান্ত জঙ্গিবাদ উসকে দেবে কি না এমন আশঙ্কার সাথে তিনি সম্পূর্ণ দ্বিমত করেন।

তিনি বলেন, “আমাদের জনগণ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। আমাদের জনগণ ধর্মভীরু তবে ধর্মান্ধ নয়।”

দেশ জঙ্গি আক্রমণের আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে না করলেও “আমরা মনে করি আমাদের জনগণ ও আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে” বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হলি আর্টিজান হামলার পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৭০ জন নিহত হলেও কারাগারে রয়েছেন মাত্র চারজন জীবিত সন্দেহভাজন। এই পরিস্থিতি নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ করে কি না এমন প্রশ্ন করলে “প্রশ্নই উঠে না” বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বেনারনিউজ: গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার এক বছর হতে চলল; এই হামলার তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে?

আসাদুজ্জামান খান: আমরা মনে করছি খুব শিগগিরই তদন্ত রিপোর্টটি দিতে পারব। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেরি করা হচ্ছে না। নির্ভুল তদন্ত রিপোর্টের জন্য সময় নিচ্ছি।

একদম স্পেসিফিক্যালি টাইম নির্ধারণ করে বলতে পারব না…

বেনার: হলি আর্টিজানের ঘটনা দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে?

আসাদুজ্জামান খান: আমরা বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা দেখেছি; কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু হলি আর্টিজান আক্রমণে আমরা দেখেছি, সংঘবদ্ধভাবে একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি জায়গায় একত্রিত হয়ে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে।

এত বড় হত্যাকাণ্ড তো আমাদের দেশে আর আগে কখনো হয়নি। তাই এই আক্রমণ আমাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট।

আজকে আমাদের জনসাধারণের একটা উপলব্ধি এসেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর যে ডাক দিয়েছেন, সে ব্যাপারে আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি।

যারা র‍্যাডিক্যালাইজড হয়ে গেছে তাদের ফিরে আসার যে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, সে ব্যাপারেও অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে।

আমরা দেখেছি মা তার ছেলেকে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন এই বলে যে ছেলেটি বিভ্রান্ত হয়েছে। আমরা তাদের ডির‍্যাডিক্যালাইজড করার জন্য কাজ করছি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে।

তারপর দেখেছেন যারা হত হয়েছে তাদের বাবা-মা ডেড বডি নিতে আসেনি। তারা রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণায় তাদের আত্মীয় বলে পরিচয় দিচ্ছে না। এটাই হলো বাংলাদেশ, এটাই আমাদের বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র।

বাংলাদেশের মানুষ কখনো সন্ত্রাস, এ ধরনের খুন-খারাবি পছন্দ করে না। তারা প্রতিবেশীর জন্য, দেশের জন্য জীবন দেয়।

বেনার: হলি আর্টিজানের ঘটনার পর আমরা দেখেছি নিরাপত্তা বাহিনী প্রি-এম্পটিভ অ্যাকশনে গেছে। এই সকল ঘটনায় সন্ত্রাসীরা হয় সুইসাইডাল হয়েছে অথবা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। জঙ্গিদের অধিকাংশই ধরা পড়েনি। এটি পুলিশের দিক থেকে ইনঅ্যাডিকুয়েস কিনা?

আসাদুজ্জামান খান: প্রশ্নই উঠে না (পুলিশের দিক থেকে ইনঅ্যাডিকুয়েস প্রশ্নে)।

বেনার: হলি আর্টিজানের ঘটনার আগের ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর সময় অনেক যুবক বাসা থেকে পালিয়ে যায় এবং এ ব্যাপারে জিডিও করা হয়। তাহলে আপনারা কি ধারণা করতে পারেননি যে হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটবে?

আসাদুজ্জামান খান: হলি আর্টিজানের ঘটনার আগে তাভেল্লা সিজার হত্যাকাণ্ড ঘটে; কুনিও হোসি হত্যা করা হয়; পঞ্চগড়ের ইসকন মন্দিরে হামলা হয়; বান্দরবানে বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করা হয়; দুই খ্রিস্টান ফাদারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়; শিয়া মসজিদের ইমামকে হত্যার চেষ্টা হয় এবং মুয়াজ্জিনকে হত্যা করা হয়।

এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মে-ধর্মে একটি সংঘাত সৃষ্টি করা। আমরা সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের একত্রিত করে বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে বলেছি আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। আমরা ধর্মে-ধর্মে বিভেদ সৃষ্টির পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছি।

আমরা সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের শিক্ষক, পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে ধারাবাহিক মিটিং করেছি। তাদের বলেছি যেসব ছেলেরা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছে তাদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর দেবেন। আমরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা সংবাদপত্রে প্রকাশ করেছি।

বাইরে থেকেও কিছু ইন্ধন ছিল বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার করার জন্য। যেমন কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরী। উনি এসেছিলেন, এখানে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য। উনি একটি ভুল মেসেজ নিয়ে আসলেন—যেসব মুসলমানরা এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাবে তারা সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে।

কিন্তু আমাদের জনগণ তার সেই মেসেজ প্রত্যাখ্যান করেছে; তাকে কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়নি। বরং, সে যেখানে ছিল সে সম্পর্কে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীকে জানিয়েছিল।

জনগণের সহায়তায়, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনী তাদের আস্তানা একের পর এক গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

বেনার: কারা এই আক্রমণকারী?

আসাদুজ্জামান খান: এরা সবাই আমাদের বাংলাদেশের মানুষ। এরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে আত্মপ্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যারা বিরোধিতা করেছিল তারাই বিভিন্ন সময় শক্তিশালী হওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে।

বেনার: এর অর্থ হলো রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামী?

আসাদুজ্জামান খান: আমরা অনুসন্ধান করে তাই পাচ্ছি। যত জঙ্গি, হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা যাই বলেন এদের নেতাদের ইতিহাস দেখলে দেখা যায় এরা জামায়াতে ইসলাম অথবা ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা ছিল।

বেনার: এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি কতটা আছে বলে আপনি মনে করেন?

আসাদুজ্জামান খান: আমাদের জনগণ জঙ্গিবাদকে পছন্দ করে না, সন্ত্রাস পছন্দ করে না। আমাদের জনগণ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। আমাদের জনগণ ধর্মভীরু তবে ধর্মান্ধ নয়।

কাজেই যতই প্রচেষ্টা হোক আমাদের জনগণ কোনো দিনই এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। জনগণের সমর্থন না পেলে এরা কিছুই করতে পারবে না। আমি মনে করি আমাদের কোনো ভয়ভীতি, আশঙ্কা নেই।

তা সত্ত্বেও আমরা মনে করি না যে আমরা এদের থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। আমরা মনে করি আমাদের জনগণ ও আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

বেনার: সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে সমর্থন দিয়েছে? এ সিদ্ধান্তগুলো জঙ্গিবাদ উসকে দেবে কি না?

আসাদুজ্জামান খান: কোনো প্রশ্নই আসে না। কওমি মাদ্রাসার মানুষ এরা কারা? এরা ইসলামকে ভালোবাসে; ইসলামকে হৃদয়ে ধারণ করে …তারাও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বলছে।

আমাদের কাছে যে বেসরকারি হিসাব আছে সেটা অনুযায়ী ১৬ লক্ষ ছেলে-মেয়ে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে লেখাপড়া করে। এই সংখ্যা কম নয়। যদি আমরা তাদের মূলধারায় আনতে পারি, এদের যদি আমরা শিক্ষার আলো দিতে পারি তারা ভালো থাকবে।

কাজেই এ সিদ্ধান্তগুলো জঙ্গিবাদ উসকে দেবে না।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন