Follow us

হলি আর্টিজানে নিহত বিদেশিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেবে বাংলাদেশ

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2017-07-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
হলি আর্টিজানে হামলার এক বছর পূর্তিতে নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ। জুলাই ০১, ২০১৭।
হলি আর্টিজানে হামলার এক বছর পূর্তিতে নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ। জুলাই ০১, ২০১৭।
জেসমিন পাপড়ি/বেনারনিউজ

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় জিম্মি অবস্থায় নিহত বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের ২০ জন নাগরিককে ক্ষতিপূরণ দিতে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিদেশি ১৭ নাগরিকের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে এই ক্ষতিপূরণের টাকা পৌঁছে দেবে।

ওই হামলার ঘটনায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে আগেই অনুদান দেয়া হয়েছে। তবে একই ঘটনায় জঙ্গি সন্দেহে নিহত হবার কারণে হলি আর্টিজান বেকারির দুই কর্মচারীর পরিবার কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা অনুদান পাচ্ছে না।

সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পরিবার প্রতি ১৫ হাজার ইউরো বা ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

এই খাতে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অনুকূলে তিন লাখ ইউরোর সমপরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

গত মঙ্গলবার অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. রাজিবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ৩০ জুলাই তারিখের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

“আমরা এ বিষয়ে নির্দেশনা পেয়েছি। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা যোগাযোগ শুরু করেছেন,” বেনারকে বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ার ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় সশস্ত্র জঙ্গিরা।

বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের ২০ জন নাগরিককে গুলি করে এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে তারা। জিম্মি করে রাখে আরও অনেককে। নিহতদের নয়জন ইতালির নাগরিক, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং অন্য তিনজন বাংলাদেশি।

নিহতরা হলেন, ফারাজ আইয়াজ হোসেইন, অবিন্তা কবির, ইশরাত আখন্দ, তারিশি জৈন, নাদিয়া বেনেদেত্তি, ক্লউডিও কাপেলি, ভিনসেনজো দাল্লেসত্রো, ক্লাউদিয়া মারিয়া ডি এন্তোনা, সিমিনা রোস্তি, এদেল পিগলিসি, ক্রিসটিয়ান রোজি, মারিয়া রিবোলি, মারকো তনদাত, তানাকা হিরোশি, ওগাসাওয়ারা, শাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই ও হাশিমাতো হিদেইকো।

ওই হামলায় দু'জন পুলিশ কর্মকর্তাও প্রাণ হারান। নিহত হন বেকারির দুই কর্মচারীও।

ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শাহদাত হোসেন টেলিফোনে বেনারকে বলেন, “সেদিনের ঘটনায় নিহত ইতালির নাগরিকদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বেশ গরিব। তাঁদের পরিবারের পক্ষে থেকে অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার সুবিবেচনায় নিয়েছেন।”

আশা করছি শিগগিরই সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ তাঁদের হাতে তুলে দিতে পারব, বলেন তিনি।

এদিকে সংশ্লিষ্ট দেশের ঢাকার দূতাবাসগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকার জাপান দূতাবাসের কাউন্সেলর সেক্রেটারি ইয়াসুহারু শিনতো বেনারকে বলেন, “নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা জেনেছি। তবে এখনো বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিহতদের পরিবারগুলোতে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়া হলেও আমরা এ বিষয়ে কোনো মতামত দিতে চাই না।”

ভয়াবহ ওই হামলার পরে নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোসহ সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাংলাদেশ। এ বছরের ১ জুলাই ঘটনার এক বছর পূর্তিতে নিহতদের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধাও জানানো হয়।

ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না বেকারি কর্মচারীদের পরিবার

হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে গত বছরই আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশের পক্ষ থেকে অনুদান দেওয়া হলেও হলি আর্টিজান বেকারির নিহত দুই কর্মচারীকে পুলিশ জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করায় কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না তাঁদের পরিবার।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রবিউল ইসলামের মা করিমন নেছাকে ৫ লাখ ও তাঁর স্ত্রী উম্মে সালমাকে ১৫ লাখ টাকা এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন খানের স্ত্রী রিমা করিমকে ২০ লাখ টাকা অনুদান দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত ৯ আগস্ট আইজিপি একেএম শহীদুল হক পুলিশের কল্যাণ তহবিল থেকে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে ৪০ লাখ টাকা অনুদান দেন।

এদিকে বেকারির কর্মচারী সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের লাশ দাফন হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে। তাঁর মৃত্যুরহস্য গত এক বছরেও পরিষ্কার হয়নি। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ তাঁর পরিচয় দিয়েছিল ‘জঙ্গি আকাশ’। সাইফুলের পরিবার ও সহকর্মীরা বলে আসছেন, তিনি জঙ্গি ছিলেন না।

এ ছাড়া জঙ্গি সন্দেহে নিহত অপর বেকারি কর্মচারী হলেন জাকির হোসেন শাওন। তাঁরা দুজন কোনো অনুদান বা ক্ষতিপূরণ পাননি।

“সেদিন হোটেল কর্মচারী, পুলিশ কর্মকর্তাসহ যারা মারা গিয়েছিল (জঙ্গিরা বাদ দিয়ে) এবং আহত হয়েছিল; তাদের সকলকে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা উচিত,” বেনারকে বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান।

“যদিও অর্থের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না, তবে সরকারের এই উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। এই টোকেন মানির (টাকা) মাধ্যমে সরকার তাঁদের প্রতি সমব্যথী বা বিষয়টি নিয়ে ভাবছে সেটা প্রমাণ করে,” বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন