Follow us

বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অপহরণে জড়িত: অ্যামনেস্টি প্রতিবেদন

বেনারনিউজ স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2018-02-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
শেয়ার দিন
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণের ঘটনার প্রতিবাদে দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে ঢাকায় গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণের ঘটনার প্রতিবাদে দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে ঢাকায় গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা। ২৯ এপ্রিল ২০১২।
এপি

বাংলাদেশের সরকারি বাহিনী রুটিনমাফিকভাবে বিরোধী দলীয় সমর্থকদের গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে; বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এমনই অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

পৃথিবীর ১৫৯ টি দেশের গত বছরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি করা সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনটিতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ৮০টির বেশি গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

“পরবর্তীতে অপহৃত অনেকেরই মৃতদেহ পাওয়া যায়,” বলা হয় লন্ডন ভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে।

এতে মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নিপীড়নমূলক আচরণ, নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধাদানের জন্যও শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা করা হয়।

তবে গুম ও অপহরণ ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা বরাবরের মতোই অস্বীকার করে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার।

“এগুলো (অভিযোগগুলো) সব একই পুরনো কথা। এগুলো ঠিক নয়। আমরা এগুলো প্রত্যাখান করি,” প্রতিবেদনটি সম্পর্কে বেনারকে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেন, সব মানবাধিকার সংগঠন একই রকমের অভিযোগ তুলে আসছে।

“আমরা তথাকথিত প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে দেখেছি যে, সরকারকে বিব্রত করতে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই ইচ্ছা করে লুকিয়ে থাকে,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন “আমরা তথাকথিত প্রতিটি গুমের ঘটনা সিরিয়াসলি নিয়ে থাকি ও তদন্ত করি।”

মাত্র এক মাস আগে অন্য একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাঁদের ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের সরকারি বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমসহ বিভিন্ন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

সেই প্রতিবেদনটিতে “সত্যতা নেই” বলে সেসময় বেনারের কাছে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তবে গুম ও অপহরণে জড়িত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

দেশের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “দেখুন আমরা মানবাধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে গুম-খুনের ঘটনা নিয়ে সরকারকে বলে যাচ্ছি। আর সরকার যথারীতি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে চলেছে।”

“আর অস্বীকারের সংস্কৃতির ফলাফল হলো, যারা এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে ও কাজগুলো করেই চলেছে”, বলেন লিটন।

তিনি বলেন, নারায়নগঞ্জে র‌্যাব সদস্যদের হাতে সাত খুনের ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, দেশে গুম-খুনের ঘটনার সাথে রাষ্ট্রের বাহিনীগুলো যুক্ত আছে।

তাঁর মতে, সরকারের উচিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তোলা অভিযোগগুলো ভালোভাবে গ্রহণ করে এগুলোর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।

“কিন্তু সরকার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কথায় কর্ণপাত না করায় গুম-খুন নিয়ে সমাজে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আর এই ভীতিকর পরিস্থিতি দমন-পীড়নের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কি না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে,” বলেন নূর খান লিটন।

কয়েকটি উদাহরণ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনটিতে ২০১৭ সালের ৮০টি গুম ও অপহরণের ঘটনার মধ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অপহরণ ও ছয় মাস পরে ফিরে আসার ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ২০১৬ সালের আগস্টে অপহৃত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ মীর আহমেদ বিন কাশেম ও আব্দুল্লাহিল আমান আজমির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

আহমেদ বিন কাশেম একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামাত নেতা মীর কাসেম এবং আব্দুল্লাহিল আজমি একই অপরাধে আমৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযমের ছেলে।

প্রতিবেদনটিতে গত এপ্রিলে সুইডেনের একটি রেডিওতে র‍্যাব এর এক সাবেক কর্মকর্তার গোপন সাক্ষাৎকারের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়। যেখানে কীভাবে র‍্যাব গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটায় তার বর্ণনা ওই কর্মকর্তা দিয়েছিলেন।

এছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মুবাশ্বার হাসানের অপহরণ ও ফিরে আসার ঘটনাও উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মুবাশ্বার গত বছরের শেষ দিকে ঢাকা থেকে অপহৃত হবার ছয় সপ্তাহ পরে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশের সদ্য অনুমোদিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ সরকার অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সমালোচনাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।”

প্রসঙ্গত, গত জানুয়ারিতে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা। এই আইনটির বিরুদ্ধে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

মন্তব্য (0)
পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন