Follow us

রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবি মানবাধিকার কর্মীদের

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2018-06-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আন্তর্জাতিক নির্যাতন বিরোধী দিবসে কলকাতায় নির্যাতিতদের মিছিল। ২৬ জুন ২০১৮।
আন্তর্জাতিক নির্যাতন বিরোধী দিবসে কলকাতায় নির্যাতিতদের মিছিল। ২৬ জুন ২০১৮।
বেনারনিউজ

রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক নির্যাতন বিরোধী দিবসে রাষ্ট্রীয় মদতে নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ এবং প্রতিকার চেয়ে কলকাতার রাজপথে মিছিল করেন নির্যাতনের শিকার এবং বিচারবহির্ভূতভাবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। এ সভায় নির্যাতিতাদের বয়ানে নির্যাতনের ভযাবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) উপদেষ্টা কিরীটি রায় বেনারকে বলেন, “পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী ও কারা কর্মীদের দ্বারা মানুষ প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। সরকারি উর্দিধারীদের এহেন আচরণের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।”

“বাস্তবে এক নিঃশাস্তির রাজত্ব চলছে। প্রতিবাদ জানালে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া থেকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়,” বলেন তিনি।

মাসুমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে ১ হাজার ৪১৯টি নির্যাতনের এবং ১২৬টি বিচারবহির্ভূত হত্যার তথ্যানুসন্ধান করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জানানো হলেও তাঁরা কোনো উত্তর পাননি।

বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ডা. বিনায়ক সেন নির্যাতন প্রতিরোধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সুবিচার ও স্থায়ী প্রতিকারের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার কয়েক হাজার দৃষ্টান্ত এদিন লিখিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

নির্যাতিতদের কষ্ট কথা

মঙ্গলবারের সভায় নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষ উপস্থিত থেকে নিজেদের উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত অত্যাচারের বর্ণনা দেন। মুর্শিদাবাদের বাবর আলি, জাহাঙ্গির আলম, কোচবিহারের আমিনুল হক, উত্তর ২৪ পরগণার সাবেরা বিবি ও মোসলেমার (নাম পরিবর্তিত) মতো নির্যাতিত বেশ কিছু মানুষ তাঁদের উপর সংগঠিত নির্যাতনের প্রতিকারের দাবি জানান।

সাবেরা বিবি বেনারকে বলেন, “সীমান্ত এলাকায় আমার মতো অনেক নারীকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে যৌন হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।”

জাহাঙ্গীর আলম বেনারকে বলেন, “পুলিশের গাড়ি চেকিংয়ের নামে অন্যায় ব্যবহারের প্রতিবাদ করায় তাঁকে অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।”

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্যালেট গান থেকে ছোঁড়া গুলিতে আহত কোচবিহারের দিনহাটার আমিনুল জানান, হাতে এখনো বেশ কিছু ছররা গুলি নিয়ে তিনি প্রতিবন্ধীতে পরিণত হয়েছেন।

আমিনুল বেনারকে বলেন, “কোনো প্রতিকার তো দূরের কথা, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পর্যন্ত পাইনি।”

বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার বেনারকে বলেন, “সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে রয়েছে। অথচ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মী বা অফিসারের শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি।”

ঐক্যবদ্ধ আন্দেলনের মাধ্যমেই নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

মানবাধিকার কর্মীদের দাবি

এদিনের নির্যাতন বিরোধী সভা থেকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সকল ঘটনার যোগ্য ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়। সেইসঙ্গে অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিক বা সুরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির অধীনে গ্রেপ্তার করারও দাবি জানানো হয়।

কিরীটি রায় বলেন, “যৌথ প্রতিরোধের কিছু ফল পাওয়া গেছে ঠিকই। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পুলিশ ও বিএসএফ আধিকারিক শাস্তি পাননি। এই নিঃশাস্তি সীমান্তে বিএসএফকে ট্রিগার হ্যাপি করে তুলেছে এবং পুলিশকে করেছে বেপরোয়া ও উদ্ধত।”

মানবাধিকার কর্মী বিপ্লব মুখার্জি বেনারকে বলেন, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২৮টি ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেবার নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও এর পেছনে যুক্ত কাউকে শাস্তি দেয়ার কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।”

নির্যাতন বিরোধী সনদ অনুমোদনের দাবি

ভারত সরকার দ্রুত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি; জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী সনদকে (ইউএনক্যাট) অনুমোদন (র‌্যাটিফাই) করুক, মানবাধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের পক্ষ থেকে সে দাবিও জানানো হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভারত সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলো নিজেদের এলাকায় মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী প্রয়োগে অনিচ্ছুক। আর তাই জাতিসংঘের কাছে সনদ অনুমোদন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা করছে না সরকার।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠন ও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা ২৬ জুনকে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নির্যাতন বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৭ সালে কার্যকর হওয়া এই মানবাধিকার চুক্তিতে ভারত ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষর করলেও এখনো পর্যন্ত এটি র‌্যাটিফাই করেনি।

কিরীটি রায় বলেন, “এই চুক্তিতে নির্যাতন এবং যে কোনো ধরনের নৃশংস ও অমানবিক কার্যক্রম প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ভারত এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন