Follow us

কক্সবাজারে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত তিন, পুলিশ বলছে মানব পাচারকারী

জেসমিন পাপড়ি ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2019-06-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে টেকনাফ পুলিশের হাতে আটক হয়ে আবার শরণার্থী শিবিরে ফিরে আসা এক রোহিঙ্গা নারী। ২৫ মে ২০১৯।
সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে টেকনাফ পুলিশের হাতে আটক হয়ে আবার শরণার্থী শিবিরে ফিরে আসা এক রোহিঙ্গা নারী। ২৫ মে ২০১৯।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারের টেকনাফে তিন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, নিহতরা সমুদ্রপথে মানব পাচারের সাথে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য ছিলেন।

মঙ্গলবার ভোর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালিয়া পাড়ায় গোলাগুলির ওই ঘটনা ঘটে বলে বেনারকে জানান টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ।

নিহতরা হলেন; টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী পাড়ার আলী হোসেনের ছেলে আব্দুল কাদের (২৫) একই এলাকার সুলতান আহমদের ছেলে আব্দুর রহমান (৩০) ও সাবরাংয়ের নয়াপাড়ার আব্দুর শুক্করের ছেলে কুরবান আলী (৩০)।

“নিহত তিনজনই প্রায় দেড় মাস আগে টেকনাফ থেকে ১৫ জন রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পাচারের চেষ্টার সময় হওয়া মামলার আসামি ছিলেন,” বলেন তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নিহতদের পরিবার বলেছে, তারা মানব পাচারকারী ছিলেন না।

নিহত আবদুর রহমানের বাবা সুলতান আহমদ বেনারকে বলেন, “আমার ছেলে কোনো ধরনের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল না। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও ছিল না।”

তাঁর দাবি, গতকাল (সোমবার) রাতে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

এই নিয়ে তিন দিনের ব্যবধানে টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে পাঁচ জন নিহত হলেন। এর আগে রোরবার ভোর রাতে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবুনিয়া নৌকা ঘাট এলাকায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মানবপাচার মামলার দুজন আসামি নিহত হন। যাদের একজন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা।

ওসি প্রদীপ কুমার দাস জানান, গত বছরের ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত শুধু টেকনাফে ১০১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে ১৫ জন মানবপাচাকারী। যাদের ৮ জন গত এক মাসে নিহত হন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে নয় বরং দেশে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগের মাধ্যমেই মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব।

শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) রিসার্চ ফেলো অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বেনারকে বলেন, “বন্দুকযুদ্ধে আসামির মৃত্যু আমাদের দেশের ইমেজের জন্যও ভালো নয়।”

“রাষ্ট্রের আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তেই থাকবে। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল করা গেছে পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত নেই,” বলেন তিনি।

ড. জালাল বলেন, “আমাদের দেশে শক্ত আইন আছে। সে আইনের প্রয়োগ করতে হবে।”

“এর আগেও মানব পাচারকারীদের ক্রসফায়ার হয়েছে। তাতে কিন্তু এ অপরাধ কমেনি। তাই আইনের যথাযথভাবে প্রয়োগই সমাধান আনতে পারে,” বলেন এই গবেষক।

আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর দাবি পুলিশের

ওসি প্রদীপের বর্ণনা অনুযায়ী, মানব পাচার মামলার পলাতক এই তিন আসামি মহেশখালিয়া পাড়ায় অবস্থান করছে খবর পেয়ে মঙ্গলবার ভোর রাতে সেখানে অভিযানে যায় পুলিশের একটি দল।

“পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর পর পাচারকারী চক্রের সদস্যরা গুলি ছুড়তে থাকে। তখন আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।”

মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে একপর্যায়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের প্রথমে টেকনাফ উপজেলা হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসার পর তাঁদের অবস্থার অবনতি ঘটলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানোর সময় তাঁদের মৃত্যু হয়।

ওই ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

টেকনাফ উপজেলা চিকিৎসক শোভন দাস বেনারকে বলেন, “পুলিশ ভোর রাতে গুলিবিদ্ধ তিনজনকে নিয়ে আসে। তাঁদের শরীরে বিভিন্ন অংশে গুলির আঘাত রয়েছে এবং আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

ওসি জানান, নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় তৈরি এলজি বন্দুক, কার্তুজ, গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। এ ব্যাপারে অস্ত্রসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) এর সভাপতি মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, “জীবন উন্নত আশায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমরা রোহিঙ্গা শিবিরে মানবপাচার ঠেকাতে বিভিন্ন ব্লকের মাঝিদের নিয়ে কাজ করছি।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন