Follow us

র‌্যাবকে জবাবদিহি করা যাচ্ছে না: জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-08-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ায় একটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ১২ জানুয়ারি ২০১৯।
ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ায় একটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ১২ জানুয়ারি ২০১৯।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‌্যাবকে বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মতামত দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনারের দপ্তরের নির্যাতন বিরোধী কমিটি।

র‌্যাবকে জবাবদিহি করতে তাদের কার্যক্রমের ওপর একটি স্বাধীন তদন্তের সুপারিশ করেছে নির্যাতন বিরোধী কমিটি।

এ ছাড়াও, জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী জাতিসংঘ শান্তি মিশনে আগ্রহী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কর্মকাণ্ডের ওপর আলাদা বিচার বিশ্লেষণ করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে ওই কমিটি।

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জেনেভায় গত ৩০ ও ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানির পর শুক্রবার এই মতামত প্রকাশ করে নির্যাতন বিরোধী কমিটি।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য কমিটির সুপারিশ নাকচ করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এগুলো পর্যালোচনা করে পরে সরকার বিস্তারিত জানাবে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, “দেখুন, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনারের অফিস কী বলেছে সেটা আমাকে দেখতে হবে। না দেখে মন্তব্য করা যাবে না। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। সরকার তাদের জবাবদিহি করতে পারছে না এমন মন্তব্য ঠিক নয়।”

তিনি বলেন, “তবে এটুকু বলতে পারি যে আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক দেশের চেয়ে অনেক ভালো। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। তারা দেশ থেকে সাহসের সাথে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করেছে। তাদের অনেক অর্জন রয়েছে।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “জাতিসংঘের মন্তব্যগুলো সম্পর্কে আমি পরে বিস্তারিত জানাব।”

‘জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না’

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নির্যাতন বিরোধী কমিটির মতামত সঠিক। তারা র‌্যাবসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের আওতায় একটি স্বাধীন প্রসিকিউশন বিভাগ সৃষ্টির পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রকাশিত মতামতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি অথবা ঘুষ আদায়ের জন্য নিয়মিত এবং ব্যাপকভাবে যে নির্যাতন ও চালাচ্ছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করছে কমিটি। আবার ওই সকল মামলাগুলোর ব্যাপারে জনগণ কিছু জানতে পারে না।”

কমিটি বলেছে, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে র‌্যাবকে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করা যাচ্ছে না।”

কমিটি সুপারিশে বলেছে, র‌্যাবের ওপর একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত। এছাড়া, জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী যারা শান্তি মিশনে আগ্রহী এমন কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর বিচার বিশ্লেষণ হওয়া দরকার।

৩১ জুলাই আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটির কাছে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খণ্ডন করে বক্তব্য দেন।

মন্ত্রী বলেন, সরকার কোনও ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সমর্থন করে না। জাতিসংঘ কমিটি সরকারের ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত বলেও জানান তিনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ার‌ম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি যা বলেছে সেগুলো নতুন কিছু নয়। এগুলো আমরা সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে, মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে অসংখ্যবার সরকারকে জানিয়েছি। কিন্তু সরকার বরাবর অস্বীকার করে এসেছে।”

তিনি বলেন, “আমি যখন চেয়ারম্যান ছিলাম তখন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানুষের সাথে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগ আসলে সেগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খুব কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।”

ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে পুলিশ, র‌্যাব ও আন্যান্য বাহিনীকে জবাবদিহি করতে হবে। আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা দরকার।

তিনি বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপনের ঘটনা ঘটলে পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরাই তদন্ত করে। আর তারা তদন্ত করে কোনো অভিযোগ খুঁজে পায় না।”

ড. মিজানুর রহমান বলেন, “তাই আমাদের উচিত একটি আলাদা প্রসিকিউশন বিভাগ চালু করা। পুলিশের মধ্যে যারা তদন্তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাদেরকে এই প্রসিকিউশন বিভাগের আওতায় এনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তদন্তের দায়িত্ব দেয়া যায়।”

তিনি বলেন, “তবে, এই প্রসিকিউশন বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের আওতায় না রেখে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আওতায় রাখতে হবে। আর এই পদক্ষেপ নেয়া গেলেই রাঘববোয়ালদের ক্ষমতা খর্ব হবে।”

বেশি প্রশ্ন র‍্যাবকে নিয়ে

পুলিশি কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে এবং গতিশীলতা আনতে ২০০৪ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এলিট ফোর্স র‌্যাব গঠন করে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে রাখা হয় সেনা, বিমান ও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তাদের।

তাদের অনেকেই র‌্যাবে চাকুরি শেষ করে স্ব স্ব বাহিনীতে ফিরে যান। সেখান থেকে তারা বিভিন্ন জাতিসংঘ শান্তি মিশনে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অবদান রাখা অন্যতম একটি দেশ। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠাতো। এ ছাড়াও, পুলিশ, র‌্যাব সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করে থাকে।

গঠনের পর থেকে অনেক চিহ্নিত অপরাধী র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অথবা ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। তবে মানবাধিকার কর্মীরা এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তখনকার বিরোধীদল ও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ র‌্যাব গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে।

২০০৭ সালে খালেদা জিয়ার ছেলে ও দলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হিসাবে পরিচিত তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারেককে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনের অভিযোগ করা হয় বিএনপির পক্ষ থেকে।

ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা র‌্যাবের বিরোধিতা থেকে সরে আসেন।

তবে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

চট্টগ্রামের তালসরা মাজারে ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনে র‌্যাবের সম্পৃক্ততা আদালতে প্রমাণিত হয়। র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা সাত খুন মামলায় ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। মামলাটি এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

২০১৪ সালে খালেদা জিয়া র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানান। তবে আওয়ামী লীগ সরকার র‌্যাবকে উত্তোরোত্তর শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কমিটি বলেছে, বাংলাদেশে নির্বিচার গ্রেপ্তার, গোপনে আটকে রাখা এবং গুম, মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে তারা ‘মারাত্নকভাবে শঙ্কিত’।

কমিটির ভাষায় বিচার বিভাগের ওপর চাপের কারণে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার যেসকল ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলো কাজ করতে পারছে না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সামান্যই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

কমিটির মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সুশীল সমাজের সদস্য, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী এবং সাংবাদিকরা হয়রানি এবং সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

স্বাধীন মত প্রকাশের পথে প্রধান বাধা হিসাবে চিহ্নিত আইন, যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্য প্রযুক্তি আইনকে সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

একই সাথে সন্ত্রাস বিরোধী আইন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সতর্কতার সাথে সংশোধনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে কমিটির পক্ষ থেকে।

কমিটি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এক বছরের মধ্যে অগ্রগতি জানানোর আহ্বান

জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি (ক্যাট) বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর যে উপসংহারে পৌঁছেছে তাতে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। আগামী বছরের ৯ আগস্টের মধ্যে এসব বিষয়ে অগ্রগতি জানানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিষয়গুলো হচ্ছে; এক. হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইনপয়োগকারী কর্তৃপক্ষগুলোর পুরোপুরি অনুসরণ নিশ্চিত করা।

দুই. আটক রাখার স্থানগুলো স্বাধীন কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি সংগঠন বা এনজিও প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা ও নির্বিচারে আটক ব্যাক্তিদের অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

তিন. যেসব এনজিও কমিটিকে সহযোগিতা করেছে তাদেরকে হয়রানি ও প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন