Follow us

‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’: দুই বই প্রত্যাহারের নির্দেশ হাইকোর্টের

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-02-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
একুশে বইমেলার একটি স্টলে বই দেখছেন একজন ক্রেতা। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
একুশে বইমেলার একটি স্টলে বই দেখছেন একজন ক্রেতা। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[বেনারনিউজ]

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বুধবার একুশে বইমেলা থেকে দুটি বই প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। পাঁচ বছর আগের একই দিনে ইসলাম অবমাননার কথিত অভিযোগে বইমেলা থেকে বের হবার পথে ইসলামি জঙ্গিদের হাতে খুন হন ব্লগার অভিজিৎ রায়। অভিজিৎ হত্যার বিচার এখনো শেষ হয়নি।

এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশের আগেই ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে’ এমন বিবেচনায় লেখক দিয়ার্ষি আরাগ’র লেখা ‘দিয়া আরেফিন’ এবং ‘দিয়া আরেফিন’র নানীর বাণী’ বই দুটি মেলা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বলে বুধবার বেনারকে জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা।

বইগুলো বিক্রির দায়ে গত শুক্রবার প্রকাশনা সংস্থা কালাঞ্জলির স্টলও বাতিল করেছে বাংলা একাডেমি।

লেখক দিয়ার্ষি আরাগ মূলত ব্লগ ও ফেসবুকে লেখালেখি করেন। বই দুটির প্রকাশক সৃষ্টিঘর প্রকাশনা। তবে বইমেলায় সৃষ্টিঘরের কোনো স্টল নেই।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে বই দুটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় বলে বেনারকে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

“বুধবার একজন আইনজীবী বই দুটি আদালতে উপস্থাপন করে অভিযোগ করেন যে, বইগুলোতে ইসলাম ও নবীকে অবমাননা করা হয়েছে। তিনি এব্যাপারে আদালতের কাছে নির্দেশ আশা করেন,” বলেন অমিত তালুকদার।

তিনি বলেন, “আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে বই দুটি মেলা থেকে প্রত্যাহারের জন্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে বইগুলো বিক্রি বন্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্র সচিব, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।”

এ প্রসঙ্গে একুশে বইমেলা কমিটির আহ্বায়ক ড. জালাল আহমেদ বেনারকে বলেন, “আদালত আদেশ দেবার আগেই বই দুটি মেলাতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা বই দুটি পরীক্ষা করে দেখেছি যে, এতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন কথা আছে।”

তিনি বলেন, “বইটির প্রকাশক সৃষ্টিঘরকে আমরা মেলাতে কোনো স্টল বরাদ্দ করিনি। তারা অবৈধভাবে মেলায় কালাঞ্জলির স্টল থেকে বই দুটি বিক্রি করছিল। বই দুটি বিক্রির দায়ে আমরা কালাঞ্জলির স্টল বরাদ্দ বাতিল করে দিয়েছি।”

“বইমেলার নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রকাশক অন্য প্রকাশনার বই বিক্রি করতে পারেন না,” বলেন ড. জালাল।

কালাঞ্জলি প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী নিজেকে কালের লেখক লিখন হিসাবে পরিচয় দেন। তিনি বেনারকে বলেন, “আমি আসলে বলির পাঁঠা। আমি বইটি প্রকাশ করিনি। প্রকাশ করেছে সৃষ্টিঘর নামের একটি সংস্থা। তাদের কোনো খবর নেই।”

বইটি কীভাবে তাঁর স্টলে এলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বইমেলায় যেসব লেখকদের প্রকাশনী স্টল পায় না, তাঁরা অনেকেই বিক্রির জন্য বিভিন্ন স্টলে বই রেখে যান। আমি সেকারণে বই দুটি রেখেছিলাম। বুঝতে পারিনি যে এর ভেতর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন কিছু আছে।”

লিখন বলেন, “বইগুলোর কয়েক কপি বিক্রি হয়েছে। তারপর পুলিশ, র‍্যাব, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমার কাছে এসে বইগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। আমি ওই লেখককে ফোন করলে দেখি ফোন বন্ধ। আমি তার নম্বর পুলিশকে দিয়েছি। পরে জানতে পারি সে ভারত পালিয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “গত শুক্রবার বাংলা একাডেমি আমার স্টল বরাদ্দ বাতিল করেছে। আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত।”

বইগুলো আদালতের নজরে আনা আইনজীবী আজহারুল্লাহ ভূঁইয়া আদেশের পর সাংবাদিকদের বলেন, “বই দুটিতে আমাদের মহানবী (স.) ও ইসলাম সম্পর্কে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করা হয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তির চিন্তা এবং ব্যক্তির পোশাক পরিধানের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত করা হয়েছে।”

তবে বই দুটি থেকে তাঁর বিবেচনায় আপত্তিজনক বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট কোনো উদাহরণ দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

‘অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় এ বছরেই’

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে বের হবার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ইসলামি জঙ্গিদের হাতে খুন হন ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। তাঁর বিশ্বাসের ভাইরাস বইয়ে ইসলামকে অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগে প্রথমে তিনি ফেসবুকে হত্যার হুমকি পান। এরপর তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করার দায়ে একই বছর জঙ্গিরা হত্যা করে জাগৃতির স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে। অভিজিৎ ও দীপন হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো চলমান।

ওই দুই হত্যাকাণ্ডের পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন বই মেলায় বিক্রি নিষিদ্ধ করে বাংলা একাডেমি।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার দায়ে আরও কয়েকজন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। অনেকে দেশান্তরী হয়েছেন।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী গোলাম সারোয়ার খান জাকির বেনারকে বলেন, “মোট ৩৪ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। বাকিদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করে এবছরের শেষ নাগাদ রায় পাওয়ার আশা করছি।”

“আশা করি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে,” বলেন তিনি।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় ছয়জনকে অভিযুক্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু হয় গত বছর আগস্টে। অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে চারজন কারাগারে ও দু’জন পলাতক বলে জানান গোলাম সারোয়ার।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন