Follow us

খ্রিষ্টীয় ধর্ম অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে কবি হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-05-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আটকের পর পুলিশের গাড়িতে কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন। ১৪ মে ২০১৯।
আটকের পর পুলিশের গাড়িতে কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন। ১৪ মে ২০১৯।
[সৌজন্যে: বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন]

খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধে বরিশালে কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে স্থানীয় চার্চ, বিকেলে নিজের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

“তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তিনি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন। এখানকার (বরিশালের) ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ফাদার লরেন্স লেকাভালীয়ের গোমেজ নিজেই মামলাটি করেছেন,” বেনারকে বলেন বরিশাল কোতোয়ালি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ।

হেনরী স্বপনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জামিন অযোগ্য ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে বেনারকে জানান বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক স্বপন খন্দকার।

“সকালে মামলা হওয়ার পরপরই হেনরী স্বপনকে তাঁর নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানায় নিয়ে আসা মাত্রই তাঁকে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে,” বেনারকে জানান এএসআই মাসুম বিল্লাহ।

আদালত থেকে বিকেল পাঁচটার দিকে স্বপনকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান মাসুম।

যে কারণে এই মামলা

স্বপন খন্দকার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই হেনরী স্থানীয় চার্চের অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করছিলেন। সর্বশেষ ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে উদ্‌যাপনকালে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতের ঘটনায় বরিশাল ক্যাথলিক চার্চে শোক পালন না করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সমালোচনা করেন তিনি।”

গত ২৩ এপ্রিল হেনরী স্বপন ফেসবুকে লিখেছিলেন, “শ্রীলঙ্কার খ্রিষ্ট সমাজের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে বরিশাল কাথলিক ডাইওসিসের এ রকম আয়োজনকে রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ এবং জামে কসাই মসজিদের ইমাম ও বরিশালের সকল নেতৃবৃন্দ এটিকে দুঃখজনক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেছেন।”

লেখায় তিনি বরিশাল ক্যাথলিক ডাইওসিসের (ধর্মাধ্যক্ষের এখতিয়ারভুক্ত এলাকা) বিশপ (ধর্মাধ্যক্ষ) লরেন্স সুব্রত হাওলাদারকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছিলেন।

“মূলত এটা লেখার পরই চার্চের মণ্ডলীতে যারা আছেন, তারা বিব্রত হয়ে পুলিশের সাথে ‘যোগসাজশ’ করে অতি গোপনে একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়,” যোগ করেন বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক।

মামলার বাদী ফাদার লরেন্স বেনারকে বলেন, “ইস্টার সানডে এবং পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আমাদের অনুষ্ঠানটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। এটা নিয়ে তাঁর (হেনরী স্বপনের) যে লেখা তাতে সারা বিশ্বের বিশপ, ফাদার, ব্রাদার-সিস্টারদের হেয় করা হয়েছে। তিনি আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন।”

এর আগে গত শনিবার গভীর রাতে একদল লোক বাসায় গিয়ে হেনরীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। সমগোত্রীয় লোকদের বিরুদ্ধে লেখালেখি বন্ধ করার জন্যও কবিকে শাসায় হুমকিদাতারা।

এ প্রসঙ্গে স্বপন খন্দকার বলেন, “এ ঘটনায় হেনরী নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করতে গিয়েছিল, আমিও গিয়েছিলাম তাঁর সাথে। পুলিশ তাঁর জিডি নেয়নি।”

হেনরী স্বপনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ। ১৪ মে ২০১৯। [সৌজন্যে: বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন]
হেনরী স্বপনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ। ১৪ মে ২০১৯। [সৌজন্যে: বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন]

প্রতিবাদে মুখর সুহৃদরা

এ ঘটনার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় বরিশালের অশ্বিনী কুমার হল প্রাঙ্গণে সমাবেশের পর বিক্ষোভ মিছিল করেছে বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন। বুধবার ঢাকায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) প্রতিবাদ জানাবে।

“এ ছাড়া বুধবার বিকেলে ঢাকার শাহবাগে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে কবির বন্ধু-সুহৃদরা,” বেনারকে বলেন প্রকাশক ও ছড়াকার রবীন আহসান।

ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ছড়াকার লুৎফুর রহমান লিটন ফেসবুকে লিখেছেন, “হত্যার হুমকিতে ছিলেন কবি হেনরী স্বপন। অথচ তাঁকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ! কী কাণ্ড!”

“অবিলম্বে কবি হেনরি স্বপনকে মুক্তি দেওয়া হোক। আর এমন আইনের বিলোপ করা হোক যা মানুষের বাক, মত ও শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে,” লিখেছেন ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিস অব বাংলাদেশর সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মামুন।

উল্লেখ্য, বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক কবি হেনরী স্বপন বরিশাল শহরের নবগ্রাম রোডের খ্রিষ্টান কলোনির বাসিন্দা। তাঁর সম্পাদিত 'জীবনানন্দ' কবিতাপত্রটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে দুই বাংলায় সমানভাবে সমাদৃত।

বাদী আরও যা বললেন

ফাদার লরেন্স লেকাভালীয়ের গোমেজ বেনারকে বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে নয়, চার্চের পক্ষ থেকে মামলাটি করেছি। কারণ তিনি আমাদের চার্চের বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার করেছেন। অনেকগুলো ‘স্ট্যাটাস’ তিনি ফেসবুকে দিয়েছেন, যারই পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলা করা হয়েছে।”

“হেনরী স্বপন ক্যাথলিক চার্চের একটি আবাসিক এলাকাতেই থাকেন। সেখানে তিনি অনৈতিকভাবে কিছু সুবিধা পেতে, অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থের জন্য লেখালেখির মাধ্যমে আমাদের চাপে রাখতে চাচ্ছেন। তিনি ২০১৬-১৭ সাল থেকেই এটা শুরু করেছেন,” বলেন তিনি।

ফাদার লরেন্সের দাবি, “প্রথমে আমরা তাঁকে অনেক ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেছি। কিন্তু এখন তিনি সার্বজনীনভাবে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানছেন।”

“মামলায় আরও দুজনকে অভিযুক্ত করেছি, যারা তাকে সহায়তা করেন। এরা হলের আলফ্রেড সরকার ও জুয়েল সরকার,” যোগ করেন তিনি।

চার্চের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী স্ট্যাটাসের উদাহরণ দিতে গিয়ে ফাদার বলেন, “হেনরী লিখেছেন, কম বয়সী ফাদার-ব্রাদারদের সমন্বয়ে চার্চের উদ্যোগে যুব সেমিনার আয়োজন করে আমাদের কোমলমতি যুবতীদের বলাৎকার করা হয়, বিষয়টি কোরআন শিক্ষার নামে মসজিদে মেয়েদের এনে হুজুরেরা যেভাবে পুলকিত হন, উভয়ই একই সংস্কারের উদ্যোগ।”

“আবার যিশুখ্রিষ্টের ওপর নির্মিত এক চলচ্চিত্র নিয়ে মন্তব্য করেও হেনরী আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত হেনেছেন।”

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বরিশালে যে ছয়জন জঙ্গিদের হুমকি পেয়েছিলেন, তাঁদেরই একজন এই হেনরী স্বপন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন