Follow us

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের আশ্বাস

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-05-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ডিজিটাল সিকিউরিটি বিলের ওপর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। ২২ মে ২০১৮।
ডিজিটাল সিকিউরিটি বিলের ওপর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। ২২ মে ২০১৮।
কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত আটটি ধারা নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সাংবাদিকদের ঘোরতর আপত্তির মুখে সরকারের দুই মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা আইনটি পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), সম্পাদক পরিষদ ও বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর নেতারা বিলটি সম্পর্কে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, সাংবাদিকদের মতামতকে আমলে নিয়ে আইনটিকে সংশোধন করে এমনভাবে পাশ করা হবে যাতে এটি সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না করে।

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমদ বেনারকে বলেন, “সাংবাদিকদের মতামত অনুসারে আইনটিকে স্পষ্ট করা হবে যাতে কেউ এটিকে অপব্যবহার না করতে পারে।”

গত ৯ এপ্রিল সাইবার অপরাধ দমনের লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া সংসদে উত্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। বর্তমানে বিলটি সংসদে পাশের আগে আরও পরীক্ষার জন্য টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে রয়েছে।

দুই মন্ত্রী যা বললেন

স্থায়ী কমিটির সভা থেকে বেরিয়ে আনিসুল হক বেনারকে বলেন, সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মোট আটটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তিনি বলেন, “আটটি ধারায় যে অসুবিধার কথা গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন সেগুলোর ব্যাখ্যা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমরা বক্তব্য দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি, এগুলো আমরা স্পষ্টকরণের সুপারিশ করব। যেসব সংযোজন–বিয়োজন দরকার তা করে আমরা (পাশের) সুপারিশ করব।”

মন্ত্রী বলেন, যে আটটি ধারা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংজ্ঞা স্পষ্টকরণের কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন এই আইনের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়। এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সাধারণ আইন।

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বেনারকে বলেন, বৈঠকে দুপক্ষই আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করেছে।

তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের পক্ষে থেকে যে বক্তব্য উপস্থাপনা করা হয়েছে, যে কটি ধারা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে মাননীয় আইনমন্ত্রী, আমি ও সংসদীয় কমিটি একই মত দিয়েছি।”

মন্ত্রী বলেন, “আমরা সুস্পষ্ট করে একটি কথা বলতে চাই-ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল অপরাধ দমন করার জন্য করা হয়েছে; সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ বা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা সংবিধানের ধারা লংঘনের জন্য এটা করা হয়নি।”

তিনি বলেন, “কোনোভাবেই সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা হরণ বা বাধাগ্রস্ত করার কোনো ইচ্ছায় এই আইনটি প্রণীত হয়নি। এখানে যেসব সংশোধনী প্রস্তাব এসেছে আমরা তা শ্রদ্ধার সাথে নিয়েছি। যে কটি বিষয়ে উত্থাপন হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা একমত হয়েছি।”

মন্ত্রী জব্বার বলেন, “আমরা উভয় পক্ষ একমত হয়েছি যে, এ রকম একটি আইন আমাদের দরকার। সেই আইনের যে জায়গাগুলোতে সংশোধনী করা প্রয়োজন সেটা আমরা করব।”

সাংবাদিকদের হুঁশিয়ারি

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকতার অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রে যেসব ধারায় বাধা আসতে পারে সেগুলো আমরা তুলে দিতে বলেছি।”

তিনি বলেন, “তা না হলে আমরা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছি। আমরা সাংবাদিকতা রক্ষার জন্য আন্দোলনে যাব সেটা বলে এসেছি।”

বিএফইউজে সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল সাংবাদিকদের জানান, “আমরা গণমাধ্যম যাতে সংকুচিত না হয়, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ব্যাহত না হয় সেই কথা বলেছি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আর গুপ্তচরবৃত্তি যাতে এক সাথে মিলিয়ে না ফেলা হয় সেটা বলেছি।”

বুলবুল বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাবে বলেছি, এই আইনটি প্রয়োগের সময় গণমাধ্যমের বিষয়টি এলে যেন প্রেস কাউন্সিলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, মামলা করার আগে যেন প্রেস কাউন্সিলের মতামত নেওয়া হয় যে, সেটা মামলা করার উপযোগী কি না।

স্থায়ী কমিটির সভাপতির মতামত

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমদ বেনারকে বলেন, “সম্পাদক পরিষদ, বিএফইউজে এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আমাদের কাছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে যেসব আপত্তি জানিয়েছেন সেগুলো সম্পর্কে আমরা মোটামুটি একমত।”

তিনি বলেন, “তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা স্থায়ী কমিটি আইনটিকে সংশোধন করে সংসদে পাশ করার সুপারিশ করব। আশা করি সরকার আমাদের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন।”

ইমরান আহমদ বলেন, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের আপত্তির একটি বড় অংশ হলো আইনে বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞার অস্পষ্টতা। সাংবাদিকদের আপত্তির আরেকটি বিষয় ছিল আইনে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ নিয়ে।

ইমরান আহমদ বলেন, “বিষয়টি মাথায় রেখে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে যেভাবে গুপ্তচরবৃত্তির সংজ্ঞা দেওয়া আছে সেই অনুসারে আমরা আইনে সুপারিশ করব।”

তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা একটি অপরাধ। সাংবাদিকেরা বলেছেন, তাঁদের এই ধারায় হয়রানি করা হতে পারে। আমরা বলেছি, সংশোধিত আইনে বাংলাদেশে ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে যেভাবে বিষয়টি বলা আছে সেভাবেই সুপারিশ করব।

অ্যাটকোর প্রধান ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের চেয়ারম্যান সালমান এফ. রহমান বলেন, “আমরা আইনের যেসব বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তিত, সেগুলো কমিটিকে জানিয়েছি। কমিটি আশ্বাস দিয়েছে তাঁরা আমাদের উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন। তাঁরা বর্তমানে আইনটি যেভাবে রয়েছে তা সংশোধন করে সংসদে তুলবেন।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন