Follow us

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি সাংবাদিকদের

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-10-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিবাদ সমাবেশ। ১১ অক্টোবর ২০১৮।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিবাদ সমাবেশ। ১১ অক্টোবর ২০১৮।
বেনারনিউজ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে, রাস্তায় ক্যামেরা রেখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাংবাদিকেরা। পাশাপাশি, এই আইনের কবল থেকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সম্পাদকেরা।

“আগামী শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে,” বেনারকে বলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি দৈনিক ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

বৃহস্পতিবার সম্পাদক পরিষদের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

প্রেস ক্লাবের সামনে বিরোধী দল সমর্থিত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) আয়োজিত প্রতীকী অনশন কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা বলেন, “কেউ যেন সরকারের সমালোচনা করতে না পারে এ জন্যই এ আইন কার্যকর করা হয়েছে।”

তাঁরা বলেন, “এ আইন সাংবাদিকসহ দেশের সকলকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দিয়েছে। কেউ স্বাধীনভাবে লিখতে ও বলতে পারবে না। স্বাধীন দেশে এমন আইন বাস্তবায়ন হতে পারে না।”

এদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। তাঁদের আপত্তির সুরাহা না করেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে ওই আইন পাস করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজপথে মানববন্ধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সম্পাদকবৃন্দ। পরে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এক চিঠিতে আলোচনার আহ্বান জানালে সম্পাদক পরিষদ কর্মসূচি স্থগিত করে।

৩০ সেপ্টেম্বর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য সচিব আবুয়াল হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে তাঁরা মন্ত্রিপরিষদ সভায় আইনটি আবারও মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের পাশ কাটিয়ে বিলটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। অবিকৃতভাবে তা ৮ অক্টোবর স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি।

সম্পাদক পরিষদের কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানতে বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান।

“বৈঠকে আমি যে কথা বলেছি সেই অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাব। ওনারা (সম্পাদকবৃন্দ) কর্মসূচি দিলে দেবেন”, বেনারকে জানান আনিসুল হক।

সম্পাদক পরিষদ বৃহস্পতিবার বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তিনজন মন্ত্রীর দেওয়া সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় সম্পাদক পরিষদ গভীর হতাশা প্রকাশ করছে। সম্পাদক পরিষদ বিষয়টিকে আস্থা ও বিশ্বাসের লঙ্ঘন বলে মনে করে।

সম্পাদক পরিষদ শিগগিরই শুরু হতে যাওয়া বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলেছে, আইনটিকে বাক্‌স্বাধীনতার প্রতি গুরুতর হুমকি বিবেচনা করে সাংবাদিক ও নাগরিক সম্প্রদায় যে উদ্বেগ জানিয়েছে, তা নিরসনের এটাই শেষ সুযোগ।

বাক স্বাধীনতা সংকটে

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক আইনটিকে সাম্প্রতিক সময়ে পাস হওয়া আইনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ‘খারাপ’ আইন বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বেনারকে বলেন, “এই আইনটি বাংলাদেশে এযাবৎকালের প্রণীত সবচেয়ে খারাপ আইনের একটি। এই আইন সব ধরনের মুক্তচিন্তা, বাক্‌স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। এর ফলে আমাদের গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিডিনিউজ ডট কমের সিনিয়র সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর বেনারকে বলেন, “এই আইন সংবিধান বিরোধী এবং তথ্য অধিকার আইনেরও পরিপন্থী। এর মাধ্যমে সংবিধানে রক্ষিত বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই আইনের আওতায় পুলিশ যে কোনো অজুহাতে একজন সাংবাদিকের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারবে এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবে।”

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে সরকার এ রকম একটি কালাকানুন প্রণয়ন করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সরকার সমর্থিত বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বেনারকে বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন মাধ্যমে একের পর এক সিস্টেমেটিক ভায়োলেন্স এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আসছিল। এসব নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দরকার ছিল। তবে আইনের কয়েকটি ধারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।

“আইনটির অপপ্রয়োগ রোধে উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার যাতে করে সাংবাদিকতা পেশা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়,” বলেন ইশতিয়াক রেজা।

প্রথম মামলা

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছে পাঁচ তরুণের বিরুদ্ধে। ওই তরুণেরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ‘ভুয়া’ প্রশ্নপত্র অনলাইনে বিক্রি করছিল।

গত ৮ অক্টোবর নতুন এ আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এটিই প্রথম মামলা। মামলাটি দায়ের করা হয়েছে পল্টন থানায়। বৃহস্পতিবার সিআইডি এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানায়।

সিআইডি জানিয়েছে, এই তরুণদের বিরুদ্ধে পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ এবং অনুমতি ছাড়া পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা দু ধরনের শাস্তিই হতে পারে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. কাওসার গাজী, মো. সোহেল মিয়া, মো তারিকুল ইসলাম শোভন, মো. রুবাইয়াত তানভীর (আদিত্য) ও মো. মাসুদুর রহমান। পাঁচ আসামির চারজনই ইম্পিরিয়াল কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মো. সোহেল বিকাশ এজেন্ট।

সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শারমিন জাহান বলেন, গত ৫ অক্টোবর সারা দেশে একযোগে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় মাসদুয়েক আগে থেকেই অভিযুক্তরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শতভাগ ‘কমন’ এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালাচ্ছিল। সিআইডি তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয় সহায়তা করেছেন প্রাপ্তি রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন