Follow us

আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ার আতঙ্কে কয়েক লাখ

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2019-08-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আসামের রাজধানী গুয়াহাটির একটি নাগরিকপঞ্জি সহায়তা কেন্দ্রের বাইরে তথ্য যাচাই করছে একটি পরিবার। ৩০ আগস্ট ২০১৯।
আসামের রাজধানী গুয়াহাটির একটি নাগরিকপঞ্জি সহায়তা কেন্দ্রের বাইরে তথ্য যাচাই করছে একটি পরিবার। ৩০ আগস্ট ২০১৯।
[এপি]

উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে কয়েক লাখ মানুষ রয়েছেন আতঙ্কের মধ্যে। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য বাড়তি সতর্কতা হিসেবে শুক্রবার থেকে আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে জমায়েত নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

আসাম পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল কুলধর সাইকিয়া শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, “রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বত্র নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।”

আসাম পুলিশের পক্ষ থেকে রাজ্যের ৩৩টি জেলার মধ্যে ১৫টিকে স্পর্শকাতর ঘোষণা করা হলেও জেলাগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওই সব এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

এনআরসির হালনাগাদ নিয়ে গুজব মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক টুইটে গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বলা হয়েছে, “চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার মানেই তাঁকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হবে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বাদ পড়া প্রত্যেকেই ফরেনার্স ট্রাইবুনালে তালিকা প্রকাশের পর আবেদন করতে পারবেন।”

‘বাঙালিরা প্রবল আতঙ্কে

খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪১ লাখ ১০ হাজার ১৬৯ জনের মধ্যে কতজনের নাম শেষ পর্যন্ত তালিকায় উঠবে তা নিয়ে আসামজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা তালিকা প্রকাশের পরে প্রবল অশান্তির আশঙ্কা করছেন।

কয়েক দফা আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৩১ আগস্ট শনিবার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এনআরসি কর্তৃপক্ষ জানায়, শনিবার সকাল দশটা থেকে অনলাইনে এই তালিকা দেখা যাবে। এ ছাড়া দেখা যাবে এনআরসি সেবা কেন্দ্রে।

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য টেলিফোনে বেনারকে বলেন, “কার নাম বাদ পড়বে এবং কার নাম থাকবে এই অনিশ্চয়তা নিয়ে আসামের বাঙালিরা এখন প্রবল আতঙ্কে রয়েছে।”

অল আসাম ইয়ুথ স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট ভাওয়াল বেনারকে বলেন, “এনআরসির খসড়ায় আমার বাবা, মা ও ছেলের নাম উঠলেও আমার নামই বাদ পড়েছে। ফলে এক অদ্ভুত অবস্থায় রয়েছি আমরা।”

নাগরিকপঞ্জির ভিত্তি ১৯৭১

আসাম থেকে অবৈধ বাংলাদেশি তথা বাঙালিদের বিতাড়নের দাবিতে ১৯৭৯ সাল থেকে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উপস্থিতিতে আসাম চুক্তি হয়। চু​ক্তি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যারা আসামে এসেছেন তাঁরাই ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য হবেন।

এই ভিত্তিবর্ষ ধরেই আসাম জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদের কার্যক্রম শুরু করে। এই কর্মসূচিটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

ভারত সরকারের মতে, এনআরসির মূল লক্ষ্য আসামে বসবাস করা অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কার। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি এই ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছিল।

গত বছরের ৩০ জুলাই এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর দেখা যায়, ৪০ লাখের বেশি মানুষ ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়েছেন। এদের মধ্যে ৩ লক্ষ ৯৬ হাজার মানুষ আর নতুন করে নাম তোলার আবেদন করেননি।

“সংখ্যাটি শেষ পর্যন্ত কতজনে গিয়ে দাঁড়াবে তা জানার জন্য অপেক্ষা করছি আমরা” বলেন অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য।

আসাম সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে সন্দেহজনক ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৩৮। বিদেশি সংক্রান্ত মামলা চলছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩১১ জনের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ১ লাখ ১৭ হাজার ১৬৪ জনকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি হিসেবে জমির দলিল, পাসপোর্ট, লাইফ ইন্সুরেন্স, ব্যাংক হিসাব, জন্ম সনদ, শিক্ষাগত সনদ, সরকারি চাকরির প্রমাণপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে, তাঁরা বা তাঁদের পূর্বপুরুষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে ভারতে বসবাস করছেন।

প্রথম খসড়াতে নাম তোলার জন্য নথি হিসেবে ১৯৫১ সালের এনআরসি, ১৯৬৬ ও ১৯৭১ সালের ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব সনদ, শরণার্থী সনদ এবং রেশন কার্ডও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গত বছরের ৩০ জুলাই প্রকাশিত খসড়া নাগরিকপঞ্জিতে দুই কোটি আশি লাখ মানুষের নাম তালিকাভুক্ত হয়। মোট আবেদনকারী ছিলেন তিন কোটি বিশ লাখ মানুষ। পরে অবশ্য বাদ পড়া নাগরিকেরা নাম তোলার সুযোগ পেয়েছেন।

সরকারের মতে, ভারতে বসবাসকারী ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ চিহ্নিত করাই নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ করার মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ অবশ্য দাবি করে আসছে যে, ভারতে কোনও বাংলাদেশি নেই। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এই বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বেনারকে বলেন, গত ১৯ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসার পর আমাদের বলেছেন, এনআরসি ইস্যুটি তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে তিনি এও বলেছেন, বাংলাদেশে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই।”

বাদ পড়াদের ভবিষ্যত কী?

যাদের নাম বাদ পড়বে তাঁদের সম্পর্কে ভারত সরকার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা না করায় সমালোচনা করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাঁদের মতে, সরকার একেক সময়ে একেক কথা বলছে।

এ প্রসঙ্গে সম্রাট ভাওয়াল বেনারকে বলেন, “নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে কী করা হবে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা প্রকাশ করেনি ভারত সরকার।”

“বলা হচ্ছে, নাম বাদ পড়াদের বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হবে না। আবার রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্পের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এতে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।”

ভাওয়াল বলেন, “বিপুলসংখ্যক মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে খাওয়ানোসহ অন্য সুবিধা দিতে হলে সরকারই দেউলিয়া হয়ে যাবে।”

এনআরসির গোটা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য্য মনে করেন, বাঙালিদের আসাম থেকে তাড়ানোর জন্য এটা একটা ষড়যন্ত্র। তাঁর মতে, “অনেকদিন ধরেই বিদেশি বিতাড়নের নামে বিজেপি নেতারা সোচ্চার। আর সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়।”

এদিকে নাগরিকপঞ্জির খসড়া থেকে বাদ পড়া ৮৯ শতাংশই মানসিক নির্যাতনের শিকার বলে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানা গেছে।

‘ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট টরচার’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন গত ১৬ থেকে ২২ জুলাই আসামে ৯১ জনের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক সমীক্ষা করে। এতে দেখা যায়, বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার লজ্জা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার আতঙ্কে অধিকাংশই চরম মানসিক রোগে আক্রান্ত।

গত ২৩ আগস্ট এই সমীক্ষা প্রকাশ করে সংগঠনের সমন্বয়ক সুহাস চাকমা বলেন, “এদের সকলেই অনিদ্রা, হজমের অভাব, কাজে অনীহা এবং লজ্জা ও গ্লানিতে ভুগছেন।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন