Follow us

নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় আসামের লাখো মুসলমান

ঝুমুর দেব
গৌহাটি, ভারত
2017-11-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আসামের রাজধানী গৌহাটিতে ইদ উল আজহার নামাজ পড়ছেন মুসলিমরা। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৭।
আসামের রাজধানী গৌহাটিতে ইদ উল আজহার নামাজ পড়ছেন মুসলিমরা। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৭।
AFP

ভারতের আসামে কয়েক লক্ষ বাঙালি মুসলমান নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রবিহীন মানুষে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ভারতের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) এর তালিকা প্রকাশিত হলে এই সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

১৯৫১ সালের পর প্রথমবারের মতো হালনাগাদ হতে যাওয়া নাগরিকত্বের এই তালিকার ফলে সারা ভারতে প্রায় দুই কোটি বাঙালি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বহিষ্কৃত হতে পারেন। হালনাগাদ এনআরসি ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ বরাবরই ভারতীয় বাংলা ভাষাভাষীদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নত করার ভারতীয় চেষ্টার বিরোধীতা করে আসছে। পাশাপাশি, অতীতে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে চলে যাওয়া কারো বাংলাদেশি নাগরিকত্বও স্বীকার করে না বাংলাদেশ।

নাগরিত্ব হারানোর ভয় নিয়ে আসামের প্রায় ৫ লাখ বাঙালি মুসলিমদের একজন ফাইজ, যাঁদের ভয়, ‘সকল অবৈধ বাংলাদেশিকে’ বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বছর রাজ্যের ক্ষমতায় আসা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কারণে তাঁরা এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন।

“আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে,” বেনারকে বলেন আসামের মুসলিম অধ্যুষিত বরপেটা জেলার বাসিন্দা ফাইজ রহমান।

তিনি বলেন, “আমি ষাটের দশক থেকে ভারতে বসবাস করছি, কিন্তু এটা প্রমাণ করার মতো কোনো কাগজপত্র আমার কাছে নেই। এখন এনআরসি থেকে যদি আমার নাম বাদ পড়ে, তবে আমি কোথায় যাব?”

এদিকে রাজ্য সরকার থেকে বলা হয়েছে, ১৯৫১ সালের রেজিস্টারে থাকা নাগরিক, তাঁদের উত্তরসূরি ও ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত বৈধভাবে যাঁরা এসেছেন তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই এনআরসি হালনাগাদ করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর অনুপ্রবেশ করা অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করা

ভারত ও বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোটিমার সীমান্তের মধ্যে প্রায় ২৬৫ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে আসাম রাজ্যের সাথে। আসামের শতকরা ৩৪ ভাগই মুসিলম, যা ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে শতকরা হারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে, আসামে বসবাসকারী অনেক দরিদ্র মানুষ, যারা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে সক্ষম নন, তাঁরা এনআরসির কারণে হুমকিতে পড়ে যেতে পারেন।

“কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার এটাই একমাত্র উপায়,” বেনারকে বলেন এনআরসি আসামের সমন্বয়ক প্রতীক হালেজা।

তিনি বলেন, “ভারতের কোনো বৈধ নাগরিকই চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়বেন না। তবে যারা ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাঁদের অবশ্যই জেনে রাখা উচিত যে, আজ হোক কাল হোক তাদেরকে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বলা হবে।”

তবে কেউ যদি দেখাতে পারেন যে, তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের ভেতর ভারতের কোনো ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তবে তাঁরাও ভারতের বৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।

প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ

এদিকে এনআরসি থেকে মুসলিমদের বাদ দেওয়া হলে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের হুমকি দিয়েছে সংখ্যালঘুদের সংগঠন।

“এনআরসি থেকে যদি ৫ লাখ মুসলমানকে বাদ দেওয়া হয়, তবে আসামে আগুন জ্বলবে,” বুধবার নয়াদিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন জমিয়ত উলেমা-ই হিন্দ এর সভাপতি আরশাদ মাদানি।

“বিজেপি মুসলমানদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। যখন লোকজনকে বিদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে এনআরসি থেকে বাদ দেওয়া হবে তখন কেউ বসে থাকবে না,” বলেন মাদানি।

তবে বিজেপির মতে, মাদানির মন্তব্যে মনে হয় যে কিছু গোষ্ঠী এনআরসি হালনাগাদ করার সহজ বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না।

“এখনো যেখানে খসড়াই তৈরি হয়নি, সেখানে মাদানি কীভাবে জানলেন যে রেজিস্টার থেকে ৫ লাখ লোক বাদ পড়বে? বিজেপি এটা আবারো পরিষ্কার করে বলতে চায় যে, এনআরসিতে যেমন কোনো বিদেশির নাম ঢুকবে না, তেমনি কোনো ভারতীয় নাগরিকের নামও সেখান থেকে বাদ পড়বে না,” টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন বিজেপির মুখপাত্র প্রমোদ স্বামী।

এদিকে কোনো বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম যাতে এনআরসি থেকে বাদ না দেওয়া হয় সেজন্য ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নভেম্বরের ২৭ তারিখ আসামের রাজধানী গৌহাটিতে এক কোটি বিশ লাখ লোকের এক সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন।

“আমরা দেখব প্রতিটি বৈধ ভারতীয় মুসলিম নাগরিকের নাম সেখানে আছে কি না,” বেনারকে বলেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আমিনউদ্দিন।

এদিকে প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনা নিয়ে কিছু গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়ানোর আশঙ্কায় নয়াদিল্লির কাছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী চাওয়া হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানিয়েছেন রাজ্যের এক কর্মকর্তা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন