Follow us

ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি, রাজনৈতিক বিতর্ক বাংলাদেশে

পুলক ঘটক
ঢাকা
2017-03-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পারিকর। ডিসেম্বর ১, ২০১৬।
সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পারিকর। ডিসেম্বর ১, ২০১৬।
স্টার মেইল

এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহায়তা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকেই ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে কঠোর নেতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছে রাজপথে সরকারের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্য থেকেও এই চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে মতামত এসেছে।

আগামী ৭ এপ্রিল চার দিনের সফরে দীর্ঘ সাত বছর পরে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাবেন শেখ হাসিনা। পরদিন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন তিনি।

তাঁর সফরকালে সামরিক চুক্তির ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বলা সত্ত্বেও এসব বিতর্কের ব্যাপারে উষ্মা প্রকাশ করেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি।

“শুধু স্পেকুলেশন আর স্পেক্যুলেশন। এটা কি করা উচিত?” বেনারের কাছে এভাবেই প্রতিক্রিয়া দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপু মনি।

তবে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার ব্যাপারে ভারত যে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে, পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন মিডিয়ার কাছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্রসচিবের এই বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দীপু মনি বলেন, “যে কোনো দেশ যে কোনো প্রস্তাব দিতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশ কি তাতে রাজি হয়েছে?”

ভৌগলিক স্বাধীনতা হুমকির আশঙ্কায় বিএনপি

ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের ভৌগলিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে বলে দাবি তুলেছে বিএনপি।

গত বৃহস্পতিবার এক সমাবেশে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কী চুক্তি স্বাক্ষর করবেন তা জানি না। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দেশের ভৌগলিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।”

অপর এক অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, “জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে কেন এই সামরিক চুক্তি করতে হচ্ছে।”

তাঁর মতে, “পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য ভারতের সঙ্গে এখন কেবলমাত্র তিস্তা চুক্তিই হতে পারে।”

কী থাকছে এই চুক্তিতে

এখন পর্যন্ত এই চুক্তির সম্ভাব্য দিকগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিকরা সরাসরি কিছু বলেনি। উভয় দেশের মিডিয়া এ বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার অধিকাংশই দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সরাসরি কোনো উদ্ধৃতি নেই। তবে প্রতিবেদনগুলোকে নাকচ করে দেয়নি কোনো পক্ষ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে দুই সরকার প্রধানের বৈঠকে আলোচনা হবে। এ বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এতে দু’দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, তথ্য বিনিময়, যৌথ অস্ত্র কারখানা তৈরি, অস্ত্র ক্রয়, মহাকাশ প্রযুক্তি, গবেষণা এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন বিষয় থাকবে।

ভারত দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি চাইলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, সেটা কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি হবে না -সামরিক সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে।

বিষয়টি স্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “এমওইউ এবং চুক্তির মধ্যে বিরাট ফারাক। চুক্তি করা অর্থ সেটি মানতে বাধ্য থাকা। এমওইউ-য়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যখন ইচ্ছে সেটি বাতিল করা যাবে।”

প্রতিরক্ষা চুক্তি কেন

কেন এই সহযোগিতা স্মারক, এ ধরনের কোনো চুক্তির প্রয়োজনীয়তা আছে কি না—এসব প্রশ্নে কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দু’ধরনের মতামত পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) আব্দুর রশিদ বেনারকে বলেন, “দুই দেশের মধ্যে সামরিক চুক্তি করার প্রয়োজন নেই। তবে দেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন। তাই সামরিক সহযোগিতা চুক্তি হতে পারে। সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব না করলে সামরিক সহযোগিতায় কোনো আপত্তি নেই।

২০০২ সালে বিএনপি শাসনামলে বাংলাদেশ চীন ডিফেন্স কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের ডিফেন্স কোঅপারেশন আছে। সমঝোতা স্মারকের আওতায় যাওয়া-আসা, যৌথ প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া হয়। রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সামরিক সহায়তাও। ভারত এই সবগুলো বিষয় একটি সহযোগিতা চুক্তির আওতায় আনতে চায়।”

বাংলাদেশ মূলত: চীন, রাশিয়া এবং ইতালির নিকট থেকে অস্ত্র কেনে। এবার এই তালিকায় ভারত যোগ হতে পারে।

ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা এবং অস্ত্রের ক্ষেত্রে একমুখী নির্ভরতার পরিবর্তে মাল্টিপল সোর্স তৈরির জন্য সরকারের এ সিদ্ধান্ত সঠিক বলেই মনে করেন জেনারেল রশিদ।

রাশিয়া-চীন-যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা সমরাস্ত্র এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে। সম্প্রতি চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিনও যুক্ত হয়েছে নৌবাহিনীতে। মূলত নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব কমাতেই সামরিক চুক্তির প্রস্তাব দেয় ভারত।

এ বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এন্ড সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের ডিরেক্টর ড. রাজা গোপাল ধর চক্রবর্তী বেনারকে বলেন, “ভারত বাংলাদেশকে বোঝাতে চাইছে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চীনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা ঠিক হবে না। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজারে প্রবেশ করতে চায় ভারত।

বর্তমানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে অগ্রণী ভারত বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা সামগ্রী বিক্রির লক্ষ্যে ঋণ দিয়ে একই সঙ্গে চীনকেও বার্তা দিতে চাইছে বলে মনে করেন তিনি।

হিন্দুস্তান টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, “প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ নৈকট্য বৃদ্ধি এবং সাবমেরিন ক্রয়ের পর ভারত সামরিক চুক্তির জোরালো অবস্থান নিয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ১০টির মতো চুক্তি রয়েছে, তার সবই সহযোগিতা চুক্তি; সামরিক চুক্তি নয়।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কলকাতা থেকে পরিতোষ পাল

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন