Follow us

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস ভারতের

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-07-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাক্ষাৎ করেন। ১৪ জুলাই ২০১৮।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাক্ষাৎ করেন। ১৪ জুলাই ২০১৮।
ফোকাস বাংলা

নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোসহ এ সংকট সমাধানে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে ভারত। পাশাপাশি বাংলাদেশকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত প্রতিবেশি দেশটি।

গত রোববার সচিবালয়ে ভারত-বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ষষ্ঠ বৈঠকের পর এ কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনদিনের সফর শেষে রোববারই ঢাকা ছাড়েন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনাথ সিং বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিলেন, তার মধ্যে রাজনীতির ই​ঙ্গিত খুঁজছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “রাজনাথ সিং শুধু ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নন; বিজেপির একজন উচ্চ পর্যায়ের নেতাও। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে ভারত থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া এবং এ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন এবং তার পরেই ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ সফর—সবকিছু মিলিয়ে একটি রাজনৈতিক তাৎ​পর্য বহন করে।”

“দুই দেশেরই নির্বাচন সামনে; সুতরাং এ ধরনের সফর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয়ভাবেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশই তাদের মধ্য বিদ্যমান উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়,” বলেন এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষস্থানীয় তিন নেতা ভারত সফর করে এ দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে ভারতের নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছেন।

সরকারি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গত তিনমাসের মধ্যে কয়েক দফা ভারত সফর করেছেন। এরই মধ্যে রাজনাথের সফরে রাজনৈতিক বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বেনারকে বলেন, “রাজনাথ সিং স্বাভাবিকভাবে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন সহযোগিতার কথাই বলেছেন। এগুলো নিয়ে এর আগেও নানা আলোচনা হয়েছে​।”

তবে তাঁর মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত সহযোগিতার কথা বলেছে—বিষয়টি এভাবে সরাসরি বলা যায় না। আবার নির্বাচন নিয়ে যে আলোচনা হয়নি বা হবে না, সেটিও বলা যায় না। সামনে যেহেতু জাতীয় নির্বাচন, সেহেতু বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টি আসা স্বাভাববিক,” মন্তব্য করেন তিনি।

গত রোববার বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে বাংলাদেশের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, ভারতের নয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।

বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে সহযোগিতা এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়।

পরে আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, “ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে তাঁরা পাশে থাকবেন, সহযোগিতার হাত বাড়াবেন।”

তিনি বলেন, “ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁদের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠনের অপরাধীরা বাংলাদেশে থাকতে পারে মর্মে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি‌ জমিও সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।”

বৈঠক সূত্র জানায়, এর আগে ভারত বাংলাদেশকে সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা দিয়েছিল। ওই তালিকা সংশোধন করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, তালিকায় থাকা ওইসব নামের সঙ্গে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচিত নয়।

“আজকের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে আজকের বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে,” সাংবাদিকদের বলেন রাজনাথ সিং।

এদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের সহযোগিতার হাত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

“রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত যদি উদ্যোগী ভূমিকা নেয় তাহলে সেটা আমাদের জন্য ইতিবাচক হবে,” বেনারকে বলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।

বাংলাদেশে জঙ্গি-সন্ত্রাস দমনে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে ভারত স্বাগত জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের পারষ্পরিক আলোচনার কারণে গত বছর সীমান্ত হত্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এটাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় অর্জন বলে মনে করে ভারত।

এর আগে শনিবার রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাক্ষাৎ করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যেকোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে বিশ্বাসী বাংলাদেশ।

সীমান্তে নজরদারি বাড়বে

দূরবর্তী সীমান্ত এলাকায় সীমান্ত চৌকি (বিওপি) স্থাপন, সড়ক নির্মাণ এবং নজরদারি সরঞ্জাম বসানোসহ বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে ভারত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বেশ কিছু স্থান অরক্ষিত রয়েছে এবং এসব পয়েন্ট দিয়ে যে কোনও সময় যে কেউ প্রবেশ করতে পারে। দুদেশ এ ধরনের প্রবেশ বন্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে।”

“আমরা দূরবর্তী সীমান্ত এলাকাগুলি নজরদারিতে আনার লক্ষে এসব এলাকায় বিওপি স্থাপন এবং সড়ক নির্মাণ করতে চাই সেটা ভারতকে জানিয়েছি,” বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এছাড়া সীমান্তে নজরদারি সরঞ্জাম এবং সেন্সর স্থাপন করার আগ্রহের কথাও জানানো হয়। মানব বা মাদক পাচার বন্ধে ভারত এসব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।”

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার একশ ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের সীমান্তে বেশিরভাগই অংশই অরিক্ষত।

ভিসা সহজ করার উদ্যোগ

৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দেবে ভারত।

দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে একটি চুক্তি সই হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী এবং ভারতের পক্ষে সেদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল সেক্রেটারি বিরাজ রাজ শর্মা এই ‘সংশোধিত ট্র্যাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট ২০১৮’ তে স্বাক্ষর করেন।

সম্প্রতি নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সহজ করতে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে গত শনিবার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতের ভিসা সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের মধ্যে ভারত বাংলাদেশকে সর্বোচ্চসংখ্যক ভিসা দিয়ে থাকে, যার সংখ্যা বছরে প্রায় ১০ লাখ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন