ভারতের সাথে পানি বণ্টনে অগ্রগতি নেই, চীনা অর্থায়নে সংকীর্ণ করা হবে তিস্তা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-08-13
Share
200813-BD-river-620.jpg গাইবান্ধা সদরের কামারজানি এলাকায় ভরা মৌসুমে তিস্তায় নৌকা চালাচ্ছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। ২০ জুলাই ২০১৯।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

ভারতের সাথে যৌথ নদী তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ার প্রেক্ষাপটে নদীটির দীর্ঘ মেয়াদি ব্যবস্থাপনার জন্য চীনা অর্থায়নে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

প্রকল্পটির মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৯৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার যার মধ্যে ঋণ হিসেবে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছে চীনের কাছে, বাকিটা অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ।

“চীনারা এই প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হয়েছে। আশা করা যায় ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা এই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারব,” বেনারকে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ।

প্রস্তাবিত তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেসটোরেশন প্রকল্পের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলের এই নদীর প্রস্থ কমানো হবে এবং গভীরতা বৃদ্ধি করা হবে।

সম্প্রতি যে নয়টি প্রকল্পের জন্য চীনের কাছে ছয় বিলিয়ন ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ এই প্রকল্প এর অন্তর্ভুক্ত।

তবে প্রকল্পটির অর্থ কবে ছাড় করা হবে এবং প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে জানতে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে ইমেইল পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, তিস্তায় পলির হার মারাত্মকভাবে বেশি। তাই নদীর চরিত্র অনুযায়ী পরিকল্পনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা না হলে সর্বনাশ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

শুকনা মৌসুমে রংপুরের গঙ্গাচরা এলাকায় হেঁটে তিস্তা নদী পার হচ্ছেন স্থানীয়রা। ১৫ অক্টোবার ২০০৫।
শুকনা মৌসুমে রংপুরের গঙ্গাচরা এলাকায় হেঁটে তিস্তা নদী পার হচ্ছেন স্থানীয়রা। ১৫ অক্টোবার ২০০৫।
[রয়টার্স]

নদীর প্রস্থ কমালে ‘সর্বনাশ’ হবে

তিস্তা নদীর প্রস্থ কোথাও এক কিলোমিটার, কোথাও তিন কিলোমিটার আবার কোথাও পাঁচ কিলোমিটার জানিয়ে জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর প্রস্থ এক কিলোমিটার করে এর গভীরতা কমপক্ষে ১০ মিটার করা হবে।”

“ফলে বর্ষার সময় বাড়তি পানি এসে বন্যা হবে না; নদীর পানি সাগরে চলে যাবে,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, তিস্তা নদীতে বর্ষাকালে সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ কিউসেক পানি আসে। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে কখনো কখনো ৫০০ কিউসেক পানিও থাকে না।

“আশা করা যায় প্রকল্পটি ওই অঞ্চলে সুফল বয়ে আনবে,” যোগ করেন জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ।

তবে তিস্তা নদীর প্রস্থ কমালে নদী এবং মৎস্য সম্পদের ‘সর্বনাশ’ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত।

তিনি বেনারকে বলেন, “প্রথম কথা হলো, তিস্তা নদীর গভীরতা যদি ১০ মিটার করা হয় তাহলে ভূগর্ভস্থ পানি সব নদীতে চলে আসবে এবং আশপাশের কৃষিজমিতে চাষাবাদ হবে না।”

তাঁর মতে, “তিস্তা নদীতে পলির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। দেখা যাবে বর্ষাকালে পানি আসবে ঠিকই। কিন্তু সর্বোচ্চ তিন বছর পর নদীর তলদেশ ভরে যাবে। দুকূল ভেসে বন্যা হবে।”

এছাড়া “তিস্তা নদীতে পিয়ালি নামক একটি বিশেষ মাছ পাওয়া যায়,” জানিয়ে ড. আইনুন নিশাত বলেন, “ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা রক্ষা করা হলে এই মাছের কী হবে? সেখানকার কচ্ছপের কী হবে? অন্যান্য জলজ প্রাণীগুলোর কী হবে?”

তিস্তা নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম রাজ্য। সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বৃহত্তর রংপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই নদী। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেকার ৫৪টি যৌথ নদীর মধ্যে এই নদী চতুর্থ বৃহৎ।

এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার ৩৫টি উপজেলার পাঁচ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। ২০১১ সালের হিসাব অনুসারে তিস্তা নদীর পাড়ে বাস করেন প্রায় ৯২ লাখ মানুষ।

এই নদীর পানি দিয়ে তিস্তা পাড় ছাড়াও দেশের খাদ্যভাণ্ডার হিসাবে খ্যাত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সেচ দেয়া হয়।

এশিয়া ফাউন্ডেশনের মতে জীবিকার জন্য দুই কোটি ১০ লাখ বাংলাদেশি তিস্তা নদীর ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।

অগ্রগতি নেই তিস্তা চুক্তির

ড. আইনুন নিশাত বেনারকে বলেন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে ১৯৫১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে। তবে এখন পর্যন্ত সেই চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।

২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা গতি পায়। দুদেশের কর্মকর্তারা আলোচনা করে একটি বণ্টন পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। সেই অনুসারে ভারতের জন্য ৪২ দশমিক পাঁচ ভাগ এবং বাংলাদেশের জন্য ৩৭ দশমিক পাঁচ ভাগ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়। বাকি পানি নদীর স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য রাখার কথা বলা হয়।

২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। তবে এই সফরের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সফর থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে ওই চুক্তি হয়নি। ভারতের আইন অনুযায়ী পানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের হাতে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দিল্লি সফরের সময় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে তাগিদ দেন।

ওই সফরের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন যে, তাঁর সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য কাজ করছে।

তবে এখন পর্যন্ত “তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই,” বলে বেনারকে জানান বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মাহমুদুর রহমান।

“আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসাবে বাংলাদেশ তিস্তার পানির দাবিদার,” মন্তব্য করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কর্নেল ফারুক খান বেনারকে বলেন, “আমরা এই অধিকার ছেড়ে দেবো না।”

তিনি বলেন, “তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের অধিকার আছে সেটি ভারত সরকার স্বীকার করে আবার বাংলাদেশও স্বীকার করে যে তিস্তার পানিতে ভারতের অধিকার আছে।”

“তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে দুদেশ কাজ করছে,” জানিয়ে ফারুক খান বলেন,

“তিস্তাতে কতটুকু পানি পাওয়া যায় সেব্যাপারে একটি যৌথ গবেষণা দরকার। এখন সেটি চলছে।”

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন