Follow us

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গুলির ব্যবহার বাড়িয়েছে বিএসএফ

পরিতোষ পাল ও পুলক ঘটক
কলকাতা ও ঢাকা
2017-03-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে নিয়মিত পতাকা বৈঠক করে বিজিবি-বিএসএফ। মার্চ ০৬, ২০১৭।
সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে নিয়মিত পতাকা বৈঠক করে বিজিবি-বিএসএফ। মার্চ ০৬, ২০১৭।
স্টার মেইল

বাংলাদেশ সীমান্ত পাহারা দিতে গুলির ব্যবহার বাড়িয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। শুধুমাত্র একটি ফ্রন্টিয়ারের হিসাবে দেখা গেছে, গত তিন মাসে তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ রাউন্ড গুলি করেছে। গত বছর এই হার ছিল প্রতিদিন প্রায় ১১ রাউন্ড।

মাত্র ১১৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার ক্ষেত্রে গুলির এই হিসাব দিয়েছে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার। দুই দেশের পুরো সীমান্ত এলাকা হিসাব করলে গুলির পরিমাণ আরও কয়েক গুন বেশি হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম স্থল সীমান্ত৷ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে৷ শুধু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা ২,২১৭ কি.মি.৷ এই বিস্তীর্ণ সীমান্ত পাহারা দিতে দক্ষিণবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার ছাড়াও বাহিনীর আরও ৯টি ফ্রন্টিয়ার সক্রিয় আছে।

সীমান্তে অপরাধ রোধে এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (৫৮ দিনে) শুধু দক্ষিণবঙ্গের অংশেই ৭৩৮ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছে বলে গত বুধবার বিএসএফ–এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। গত বছর (২০১৬ সালে) বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার ব্যবহার করেছিল ৪ হাজার রাউন্ড গুলি।

দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় এই এলাকা দিয়েই চোরাচালান ও অনুপ্রবেশের ঘটনা বেশি ঘটে বলে দাবি করেছে বিএসএফ।

বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকে এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩,৫৬৯ জন ভারতীয় এবং ৬,৪৪২ জন বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে আটক হয়েছে। এর মধ্যে ৩,৯৪৯ জন বাংলাদেশিকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বাকিরা ভারতের জেলে রয়েছে।

মৃত্যুর হার কত?

গুলির সংখ্যা জানালেও তাঁদের গুলিতে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তার হিসাব প্রকাশ করেনি বিএসএফ। তাঁরা বলেছে, “অপরাধীদের ঠেকাতে লিথাল (প্রাণঘাতী) ও নন-লিথাল (প্রাণঘাতী নয়)—দুই রকম অস্ত্র ব্যবহার করেছে বিএসএফ। তবে বেশির ভাগই নন-লিথাল।”

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বিএসএফ–এর হাতে গত বছর সীমান্তে ৩১ বাংলাদেশি নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। আর অপহৃত হয়েছেন ২৪ জন বাংলাদেশি।”

গত বছর নিহতদের মধ্যে ২৩জনকে গুলি করে এবং সাতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছে ৪৪জন, ২০১৪ সালে ৩৫ জন, ২০১৩ সালে ২৯ জন এবং ২০১২ সালে ৩৮ জন।

গুলিবর্ষণের ব্যাখ্যায় বিএসএফ এর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানিয়েছেন, “আত্মরক্ষার তাগিদেই একমাত্র প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক সময় টহলরত অবস্থায় হামলার মুখে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে জওয়ানরা গুলি করতে বাধ্য হন।”

বিএসএফ’র হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে অপরাধী ও পাচারকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ৪১জন বিএসএফ সদস্য আহত হলেও কেউ মারা যায়নি। ২০১৫ সালে ৬০জন বিএসএফ সদস্য আহত এবং তিনজন নিহত হন।

২০১৩ সাল থেকে এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ এর একটি ফ্রন্টিয়ার প্রাণঘাতী অস্ত্রে গুলি চালিয়েছে ৫৩৪ রাউন্ড। ২০১৬ সালে ইনসাস রাইফেলের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল ১৬২ রাউন্ড ।

অন্যদিকে ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফ প্যালেট গান থেকে ১২,৪৮৭ রাউন্ড গুলি চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালেই প্যালেট গান ব্যবহার করে ৩ হাজার ৮৪৩ রাউন্ড নন-লিথাল গুলি করা হয়েছে।

তবে বিএসএফের গুলিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নন, ভারতীয়দের জীবনহানিও ঘটছে। বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ মাসুমের সম্পাদক কিরীটী রায় বেনারকে জানিয়েছেন, “গত বছরে এই মৃত্যুর হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে।”

তাঁর মতে, “বিএসএফ–এর হাতে গত বছর প্রায় ৫০ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় ২৫-এর কাছাকাছি।”

প্যালেট গানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

ভারতের কাশ্মীরে বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর পাম্প অ্যাকশন গান বা প্যালেট গান ব্যবহার নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্যালেট গানের গুলিতে অনেকে দৃষ্টি হারিয়েছেন, গুরুতর আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ঘটেছে নিহত হওয়ার ঘটনাও।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ প্রাণঘাতী অস্ত্রের বিকল্প হিসেবে সীমান্ত সুরক্ষায় ২০১২ সাল থেকে এই প্যালেট গান ব্যবহার করছে বলে দাবি করেছেন এক বিএসএফ কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, এই অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সীমান্তে পাচার অনেক কমেছে। পাচারকারীদের মধ্যে ছররা গুলি এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে।

মাসুমের সম্পাদক কিরীটী রায় বেনারকে জানিয়েছেন, “পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এই প্যালেট গান ব্যবহার করা হলেও অনেক সাধারণ মানুষও আহত হচ্ছেন। এই গান থেকে একসঙ্গে অনেক গুলি বেরিয়ে নানা দিকে ছিটকে পড়ে।”

তিনি বলেন, “কাগজে কলমে প্যালেট গানের গুলি প্রাণঘাতী না হলেও এই গুলিতে মৃত্যুর অনেক ঘটনা ঘটছে।”

গোয়েন্দা সূত্রে জানানো হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ২০১৪ সালে প্যালেট গানের গুলিতে আহত হয়েছেন ১,৫১৭ জন। আর এক বছরের মধ্যে আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২,৩৮৫ জন। আর গত বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আহত হয়েছেন ১,৪৬৫ জন।

সুসম্পর্ক মানবিকতার দাবি

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মারণাস্ত্রের প্রয়োগ ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হলে দুই অঞ্চলের সুসম্পর্কের উন্নতি হবে। মানবিকতা ও মানবাধিকারের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

“ভারত ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী দিনরাত পরিশ্রম করছেন সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। অথচ একেকটি হত্যা দেশের জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে,” বেনারকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন।

তাঁর মতে, “দুই দেশের এই সম্পর্কের বিষয়টি উচ্চ পর্যায় থেকে বিএসএফ–এর মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের সঠিকভাবে বোঝাতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পাকিস্তান বা অন্য দেশের মতো নয়। একটি বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিককে গুলি করা যায় না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন