Follow us

ভারতে ক্ষমতায় ফিরেছে বিজেপি, বাংলাভাষী অঞ্চলেও বিপুল জয়

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2019-05-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কলকাতায় বিজেপি দপ্তরের সামনে বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের বিজয় উল্লাস। ২৩ মে ২০১৯।
কলকাতায় বিজেপি দপ্তরের সামনে বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের বিজয় উল্লাস। ২৩ মে ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে হিন্দুবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দেশটির বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যগুলোতেও এবার বিপুল জয় পেয়েছে দলটি।

ভারতে ১৯৮৪ সালের পর কোনও দল দ্বিতীয়বার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের ক্ষমতায় এলো। দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেও ভোটারদের রায় মেনে নিয়েছে।

দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে টেলিফোনে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

অভিনন্দন বার্তায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উচ্চতর এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। আর দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ইমরান খান।

শেষ দফার নির্বাচনের শেষে বুথ ফেরত জরিপেও বিজেপির বিপুল জয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে ফল তার চেয়েও ভালো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত বারোটায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মোট ৫৪২ টি আসনের মধ্যে ৩৬৪টি আসনে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়। বাকি আসনগুলোর গতিপ্রকৃতি জানানো হয়েছে।

কমিশনের ওয়েব সাইট অনুযায়ী, বিজেপি পেতে যাচ্ছে ৩০৩টি আসন। এর মধ্যে ২২১টি আসনে ইতিমধ্যেই জয় ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে।

২০১৪ সালের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনের ফলকেও ছাপিয়ে গেছে বিজেপির এবারের সাফল্য। গতবার দলটি পেয়েছিল ২৮২টি আসন।

পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির উত্থান

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উল্কার গতিতে উত্থান হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। গত লোকসভায় দুটি আসন পাওয়া দলটি এবার ১৮টি আসন পেতে যাচ্ছে। শতাংশের হিসেবে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি রাজ্যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।

যদিও রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনেই জিতবেন বলে প্রত্যয়ী ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী।

গত লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৩৪ আসন পেলেও এবার তারা পেয়েছে ২২টি আসন। তবে শতাংশের বিচারে তা ৪৩ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস দুটি আসন পেলেও বামরা একটি আসনও পাচ্ছে না বলে স্পষ্ট হয়েছে। একজন ছাড়া সব বাম প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

কংগ্রেসের বিজয়ী প্রার্থী অধীর রঞ্জন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে। সংখ্যালঘুরা মমতাকেই একমাত্র ভরসা বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে মমতার সংখ্যালঘু তোষণের বিরুদ্ধে ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন।”

তবে রাজ্য বিজেপির নেতা প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, “মেরুকরণের কোনও প্রশ্ন নেই। বরং মানুষ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতার দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চোর বলা বা যাচ্ছেতাই গালাগাল করার ঘটনাকে মোটেই ভালোভাবে নেয়নি, যা ভোটের ফলে প্রতিফলিত হয়েছে।”

উত্তরপূর্ব ভারতেও বিজেপি এগিয়ে

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি উত্তর–পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যেও বিজেপি ও তার শরীকেরা অপেক্ষাকৃত ভালো ফল করেছে। এই আট রাজ্যে মোট ২৫টি আসন রয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব বিল ইস্যুতে বিতর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং অরুণাচল প্রদেশে। কিন্তু ভোটের ফলে দেখা যাচ্ছে, এর কোনও প্রভাব পড়েনি বিজেপির ভোটবাক্সে।

আসামের ১৪টি আসনের মধ্যে নয়টিতেই বিজেপি জয়ের পথে। করিমগঞ্জের মতো সংখ্যালঘু অধ্যূষিত কেন্দ্রেও বিজেপি প্রার্থী জয়ের পথে।

এদিকে বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচর আসনেও বিজেপি প্রার্থী নিশ্চিত জয়ের পথে। গুয়াহাটি, তেজপুর, লখিমপুর, ডিব্রুগড় ও জোরহাটের মতো আসনেও বিজেপি জয় নিশ্চিত করে ফেলেছে।

ত্রিপুরায় দুটি আসনে এবং মণিপুরের একটি আসনে বিজেপি জয়ের পথে। মিজোরামে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বিজয়ের পথে। মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরাথাঙ্গা বলেছেন, তারা বিজেপিকেই সমর্থন দেবেন। মেঘালয়ের তুরা আসনে ন্যাশানাল পিপলস পার্টির আগাথা সাংমা জয়ী হয়েছেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে

অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের পর ফিরতি সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। নরেন্দ্র মোদী আবার ক্ষমতায় আসায় খুব শিগগির এ সফর হবে বলে জানিয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আবার ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাসহ অমীমাংসিত যেসব বিষয় আছে, সেগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা নেবেন নরেন্দ্র মোদী। দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ধারা সাধারণত একইভাবে চলার কারণে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “বিজেপি সরকারের সাথে পাঁচ বছর কাজ করেছে শেখ হাসিনার সরকার। দুদেশের সরকারই নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা চলবে এবং তা আরও গতিশীল হতে পারে।”

যোগাযোগ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন ভারতের আরো বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতেও সমাধান আশা করেন এই বিশ্লেষক।

“তবে তিস্তা এবং রোহিঙ্গা ইস্যু অথবা চীনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যে দুই দেশের মধ্যে যেসব অস্বস্তি আছে সেগুলো নিয়ে হয়তো আরও কাজ করতে হবে,” বলেন দেলোয়ার হোসেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিরঙ্কুশ জয়ের কারণে নরেন্দ্র মোদীর হাত শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর শক্তি ক্ষয় বা বিপর্যয় হয়েছে।

“এই পরিস্থিতিতে বিজেপি বা মোদী সত্যিকার অর্থে চাইলে এবার মমতার ওপরে চাপ সৃষ্টি করে তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ন করতে পারবেন,” মনে করেন ড. দেলোয়ার।

এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বৃহস্পতিবার বলেছেন, “বিজেপির সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং, নরেন্দ্র মোদীকে আমরা স্বাগত জানাই।”

ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে ড. মোমেন বলেন, “যদি বন্ধুত্ব থাকে, তাহলে দুই দেশ সবকিছু অর্জন করতে পারবে।”

বিপুল জয়ের ইঙ্গিত

গত লোকসভা নির্বাচনের ফলকে ছাপিয়ে গিয়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) এবারের নির্বাচনে পেতে যাচ্ছে ৩৫০টি আসন। গত নির্বাচনে জোটটি পেয়েছিল ৩৩৬টি আসন।

জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) পাচ্ছে ৯২টি আসন। অন্যান্য দলগুলি পাচ্ছে ১০০ আসন। জাতীয় কংগ্রেস এককভাবে গতবারের চেয়ে নয়টি আসন বেশি পেলেও ৫১ আসনেই তাদের থেমে যেতে হচ্ছে।

বামপন্থীদের অবস্থা এবারের নির্বাচনে আরও শোচনীয় হয়েছে। কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মতো একসময়ের বাম ঘাঁটির মধ্যে একমাত্র কেরালায় একটি আসন পেয়েছে বামেরা।

ভারতের সুরক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তানের বালাকোটে জঙ্গী শিবিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হামলার মাধ্যমে বীরত্ব প্রদর্শনের বিষয়টি যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রচারে তুলে ধরেছেন, সেটাই এবারের নির্বাচনে বাজিমাত করেছে বলে মনে করেন ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

অধ্যাপক শিবাজী প্রতিম বসু বলেন, “মোদী জাতীয় সুরক্ষার বিষয়টি সুন্দরভাবে বিপণন করেছেন।”

নির্বাচনে কংগ্রেস প্রবল ধাক্কা খেলেও এর সমস্ত দায় নিজের মাথায় নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, “জনগণ সুনির্ষ্টিভাবেই রায় দিয়েছেন। আমি রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে আমাদের লড়াই হল আদর্শের লড়াই।”

দেশের ৯০ কোটি ভোটার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। দেশের এক হাজার ৮৪১টি রাজনৈতিক দলের ৮ হাজারের বেশি প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

গত ১১ এপ্রিল শুরু হয়ে সাত দফায় ১৯ মে নির্বাচন শেষ হয়েছে। চূড়ান্ত ফল জানতে রাত পেরিয়ে ২৪ মে সকাল হয়ে যেতে পারে। তবে ভারতে ক্ষমতার গদিতে মোদী সরকারের ফিরে আসা বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত ঘোষিত ফলাফলেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন