Follow us

লোকসভার আসন বাড়াতে বিজেপির মনোযোগ পশ্চিমবঙ্গে

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2018-07-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পশ্চিমবঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সভা চলাকালে প্যান্ডেল ভেঙে আহত হন অন্তত ৯১ জন। সভা শেষে আহতদের দেখতে গেলে এক রোগীর অনুরোধে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। ১৬ জুলাই ২০১৮।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সভা চলাকালে প্যান্ডেল ভেঙে আহত হন অন্তত ৯১ জন। সভা শেষে আহতদের দেখতে গেলে এক রোগীর অনুরোধে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। ১৬ জুলাই ২০১৮।
বেনারনিউজ

ভারতের আগামী লোকসভা নির্বাচনে আসন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গকে টার্গেট করে রাজনৈতিক প্রচার শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সোমবার দুই ঘন্টার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক প্রচারের সুরটিই বেঁধে দিয়েছেন বলে মনে করেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব।

মেদিনীপুর শহরের কলেজ ময়দানে আয়োজিত কৃষক কল্যাণ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর সরকার কৃষক স্বার্থে কী কী করেছে সেসব কথা জানানোর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কড়া সমালোচনা করেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে মোদী বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ জুলুমের শাসন থেকে মুক্তি চায়। রাজ্যের মানুষ সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই রয়েছেন।”

বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বেনারকে বলেন, “রাজ্যে মা, মাটি ও মানুষের নামে সিন্ডিকেটরে দৌরাত্ম এবং জোর করে গরিবের আয় ছিনিয়ে নেওয়ার যে অভিযোগ মোদীজি করেছেন তা মানুষ প্রতিদিনই টের পাচ্ছেন।”

বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, “দক্ষিণবঙ্গের আদিবাসী জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে পরিবর্তনের বীজ রোপন করা হয়েছে। এবার তাকে বড় করে তুলতে হবে। আর তাই আগামী লোকসভা নির্বাচনের লক্ষ্যে এই অঞ্চলে প্রচারের জন্য আমরা মোদীজি ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে আসতে বলি।”

গত মাসেই দলের সভাপতি অমিত শাহ এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সফরে। সেই সময় তিনি দলীয় কর্মীদের রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২২টির বেশি আসনে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলেন।

প্রসঙ্গত পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পায় মাত্র দুইটি আসন। ৩৪টি আসন পায় তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে নাগাদ ভারতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অঞ্জন বেরা বেনারকে বলেন, “বিজেপি সরকার গত চার বছরে সার্বিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের শিল্পবৃদ্ধির হার যেমন সর্বনিম্ন (৩.২%) অবস্থায় তেমনি মূল্যবৃদ্ধি গিয়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে (৫%)। ফলে মোটেই সুবিধাজনক অবস্থায় নেই মোদী সরকার।”

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৮২টি আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আর এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সাহায্য করে উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতে পাওয়া বিপুল সংখ্যক (২৩২টি) আসন।

“সারা দেশে মানুষ এখন বিজেপিকে বর্জন করছে। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন উপনির্বাচনে পরাজয়ের ফলে বিজেপির আসন সংখ্যা নেমে এসেছে ২৭২টিতে। আর দেশের মাত্র ৩৫ শতাংশ বিধানসভা আসনে বিজেপির অস্তিত্ব রয়েছে,” বেনারকে বলেন ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি মার্কসবাদীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রবীন দেব।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের স্বার্থের কথা বলছেন, অথচ গত তিন মাসে ৬৩৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছে। দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে চলেছে বিজেপি সরকার।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বেনারকে বলেন, “ভারতের উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম অংশে বিজেপির আসন বৃদ্ধির কোনও সম্ভাবনা নেই। বরং কমার সম্ভাবনাই বেশি। এই অবস্থায় বিজেপি নেতৃত্ব আসন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ওড়িশা, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।”

“আর এই লক্ষ্য নিয়েই বিজেপির শীর্ষনেতাদের পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গ সফর করছেন”, বলেন তিনি।

বিশ্বনাথ চক্রবর্তী মনে করেন, “দক্ষিণবঙ্গকে প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে বাছাই করার পেছনে বিজেপির কৌশল কাজ করছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামসহ সন্নিহিত অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম। এই অঞ্চলের ৭টি লোকসভা কেন্দ্রকে ঘিরেই বিজেপি হিন্দুদের পাশাপাশি আদিবাসী জনজাতি ও দলিতদের ভোট সংহত করে জয় হাসিল করতে চাইছে।”

মুসলিম ভোটের মেরুকরণ

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটের মেরুকরণের জন্যই বিজেপির পক্ষে জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বনাথ চক্রবর্তী মনে করেন, “পশ্চিমবঙ্গের আট কোটি ভোটারের প্রতি তিন জনের ১ জন মুসলমান। এই মুসলমানরা অতীতে বাম ও কংগ্রেসকে ভোট দিযেছে। কিন্তু এই দুটি দল প্রায় মুছে যাবার মতো অবস্থায় পৌঁছানোয় বিরোধী মুসলিম ভোটের প্রায় সবটাই গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে।”

ফলে বিজেপি হিন্দুত্বের তাস খেলে বাজিমাত করতে চাইলেও মুসলমান ভোটের মেরুকরণই শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্যে এগিয়ে রাখবে।

মোদী বিরোধী বিক্ষোভ

“দেশের বিভিন্ন জায়গায় কৃষকদের কাছে তাড়া খেয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে মোদীকে এনেছে কৃষকদের মন ভোলাতে। আর মোদীর কাজটা সহজ করতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণ চেষ্টা করছেন,” বেনারকে বলেন মেদিনীপুরের কৃষক সভার এক সদস্য। তিনি বলেন, মেদিনীপুরে মোদীর ভাঁওতাবাজির প্রতিবাদে কালো পতাকা দেখিয়ে প্রতিবাদ জানায় কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদীর কৃষক সভা।

তৃণমূল কংগ্রেসও এদিন মোদীকে কালো পতাকা দেখায়। তৃণমূল কংগ্রেসের মেদিনীপুরের সভাপতি অজিত মাইতি বলেন, “মোদী মোটেই কৃষক বন্ধু নন। বরং তিনি কৃষক বিরোধী। আর তাই গত রবি ও সোমবার আমরা মোদী বিরোধী বিক্ষোভ করি।”

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে প্রধানমন্ত্রীর তীব্র আক্রমণ করার প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বিজেপিকে আগুন নিয়ে খেলা না করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

বিজেপিকে সাম্প্রদায়িকতার সিন্ডিকেট, দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং হত্যার সিন্ডিকেট হিসেবে অভিহিত করা হয়।

তৃণমূল কংগ্রেসের মতে, প্রধানমন্ত্রী মেদিনীপুরে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে উন্নয়নের কোনও কথা নেই। সবটাই রাজনৈতিক ভাষণ।

মোদীর সভায় প্যান্ডেল ভেঙ্গে আহত ৯১

মেদিনীপুরে মোদির সভাস্থলে প্যান্ডেলের একাংশ ভেঙ্গে প্রায় ৯১ জন আহত হন। এদের মধ্যে ১৬ জন নারী।

প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেওয়ার সময়ই এই দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে জানান বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ।

বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু সাংবাদিকদের বলেন, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সভাস্থল ছেড়ে যাওয়ার পথে হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলেন চিকিৎসকদের সঙ্গেও। তিনি চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন দলকে।

বিজেপি সূত্রের খবর, কয়েকজনকে কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক টুইট বার্তায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করার পাশাপাশি চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন