Follow us

আইএস এলাকায় যাওয়া তরুণদের দেশে ফেরা নিয়ে সতর্ক পুলিশ

ঢাকা থেকে প্রাপ্তি রহমান
2017-01-31
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জঙ্গি দমন অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের আদালত ও জেলখানায় এভাবেই নেওয়া হয়। নভেম্বর ২০১৫।
জঙ্গি দমন অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের আদালত ও জেলখানায় এভাবেই নেওয়া হয়। নভেম্বর ২০১৫।
স্টার মেইল

ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) অধ্যুষিত অঞ্চলে থাকা বাংলাদেশিরা যেন দেশে ফিরে গা ঢাকা দিতে না পারে, সে জন্য বিশেষ সতর্কতা নিয়েছে পুলিশ। বিমানবন্দর ও সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

পাশাপাশি, দ্বৈত পাসপোর্টধারী সন্দেহভাজনরাও যাতে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে পুলিশ।

অব্যাহত অভিযানের মুখে আইএস অধ্যুষিত এলাকা ছেড়ে অনেকে বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় ইরাক ও সিরিয়া ফেরত জঙ্গিদের আগমন মোকাবেলা করতে নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

পুলিশ সদর দপ্তর গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিখোঁজ ৬০ জনের একটি তালিকা হালনাগাদ করে। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এর প্রায় অর্ধেক দেশের বাইরে চলে গেছে। তিন–চারজন ফেরত এসেছে। তারা বিভিন্ন কারাগারে আটক আছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, তাঁরা পরিস্থিতির ওপর নজর রেখেছেন।

“ওরা ইতিমধ্যেই চিহ্নিত। আশা করি, তারা দেশে ফিরে গা ঢাকা দিতে পারবে না। এর আগে যারা ফিরেছে, তারা দেশের বিভিন্ন কারাগারে আছে,” জানান মনিরুল ইসলাম।

দ্বৈত পাসপোর্টধারীদের বি​ষয়ে সতর্কতা

দ্বৈত পাসপোর্টধারীদের নিয়ে পুলিশ সতর্কতা অবলম্বন করছে। সিটি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ এখন এমন দ্বৈত পাসপোর্টধারীর তালিকা তৈরির কাজ করছে।

পুলিশ সদর দপ্তরে কাউন্টার টেররিজমের ফোকাল পয়েন্ট মনিরুজ্জামান বেনারকে বলেন, তাঁদের কাছে এখন পর্যন্ত সাইফুল হক সুজন ও আশিকুর রহমানের নিহত হওয়ার খবর আছে।

“আমরা আইএসে বিদেশি যোদ্ধাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করছি ও নিয়মিত হালনাগাদ করছি। সম্মুখ সমরে কারও থাকার কো​নো খবর এখনো আমরা পাইনি। আইএস দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সেখানে যারা গিয়েছিল তারাও স্থান ত্যাগ করছে বলে খবর পাচ্ছি”, বলেন মনিরুজ্জামান।

অভিযোগ আছে, আইএসে যোগ দেওয়ার আগে কেউ কেউ বাংলাদেশ হয়ে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছেছে। তারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করতে পারে এমন আশঙ্কা আছে।

পুলিশ বলছে, এমন কমপক্ষে ২০ জনের ব্যাপারে তথ্য নেওয়া হয়েছে, যারা বাংলাদেশ হয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে। এই তালিকার প্রথমের দিকে আছে ব্রিটেনের লুটন থেকে বাংলাদেশ হয়ে ইস্তাম্বুল যাওয়া একটি পরিবার। ওই পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১২।

পুলিশ আরও বলছে, পরিবারটি ২০১৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ভাগে বাংলাদেশে আসে। ১১ মে বাংলাদেশ থেকে আইএস অধ্যুষিত এলাকায় চলে যায়। ১৭ মের পর লুটন বা বাংলাদেশে তাদের আর দেখা যায়নি।

ঢাকার বসুন্ধরা এলাকার দুই ভাই জুনাইদ হাসান খান ও ইব্রাহীম হাসান খান বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। তারা সপরিবারে সৌদি আরবে থাকে। ২০১৫ সাল থেকে আইএস অধ্যুষিত এলাকায় আছে বলে পুলিশের কাছে খবর আছে।

সপরিবারে বুলগেরিয়া যাওয়ার কথা বলে সাইফুল্লাহ ওজাকি গত বছরের জানুয়ারিতে নিখোঁজ হয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই সাইফুল্লাহ জাপানে পড়তে গিয়ে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। জাপানের একজন নাগরিককে বিয়ে করে সে সেখানে স্থায়ী হয়।

অনুসন্ধানে পুলিশ জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল গত বছর পর্যন্ত। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, সাইফুল্লাহ বাংলাদেশ থেকে দুজনকে সিরিয়ায় পাঠাতে সহযোগিতা করেছে। তারা কারা সে সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

এর বাইরে বোমা হামলায় নিহত কম্পিউটার প্রকৌশলী সাইফুল হক সুজনের স্ত্রী সায়মা আক্তার মুক্তা, সুজনের শ্যালিকা রাবেয়া আক্তার টুম্পা ও তাঁর স্বামী শরীফুল হক ইমন মধ্যপ্রাচ্যে আছে।

শরীফুল হক ইমন নিহত সুজনের আপন ভাই। তালিকায় আরও আছে শিশু চিকিৎ​সক মো. রোকনউদ্দীন, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ​বড় মেয়ের স্বামীসহ আরও বেশ কটি পরিবার।

কয়েকটি পরিবারের বক্তব্য

আইএসে যোগ দিতে যাওয়া লোকজন দেশে ফিরতে চাইছে কি না, সে ব্যাপারে পরিবারগুলো কিছু জানাতে পারেনি।

শিশু চিকিৎ​সক রোকনউদ্দীনের শ্যালিকা ডা. হালিমা বেগম বেনারকে বলেন, তারা এমন কোনো খবর পাননি।

“আগস্ট–সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সেই ফোন করত। আমি জিজ্ঞাসা করেছি তোমরা কোথায় আছ। পরিস্কার করে কিছু বলত না। ইদানীং যোগাযোগ হয় না। বেঁচে আছে কি না তা-ও জানি না,” জানান হালিমা।

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর হামলাকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে যে ভিডিও ক্লিপটি প্রকাশ হয় সেখানে তাহমিদ সাফি, আরাফাত রহমান তুষার ও তাওসিফ নামের তিন তরুণকে দেখা যায়।

তাহমিদ সাফির পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তবে, তাঁদের একজন পারিবারিক বন্ধু জানায়, আগস্ট–সেপ্টেম্বরের পর তাহমিদ পরিবারের সঙ্গে যোগযোগ করেনি।

এর আগে সে ফোনে তাঁর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বা খুদে বার্তা পাঠিয়েছে। সিরিয়ায় স্ত্রী সায়েমা খানকে সঙ্গে নিয়ে গেছে তাহমিদ। সেখানে তাদের একটি মেয়েও হয়েছে। তারা এখন বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা করছে কি না পরিবার বা পুলিশের কাছে সে খবর নেই।

আরাফাত রহমান তুষারের বারিধারা বাসায় গেলে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা বেগম বেনারকে জানান, তাঁরা কিছুই জানেন না।

আরাফাত নিখোঁজ হওয়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি জিডি হয়। ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশ জানায়, আরাফাত দেশ ছাড়ার পর বেশ কিছুটা সময় মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বেঁচে আছে কি না বা কোথায় আছেন সে সম্পর্কে পুলিশ ও পরিবার এখন আর কিছু জানে না।

সিরিয়া ফেরত তরুণ কারাগারে

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গাজী কামরুস সালাম সোহান পেশায় একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ২০১৫ সালে দেশ ছাড়ার আগে বিদ্যুৎ​ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

সোহান ওই বছরের মে মাসে তুরস্ক পুলিশের কাঁটাতারের বেড়া টপকে চলে আসার চেষ্টা করছিলেন। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন। তারপর তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

গত বছরের ১৭ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায় র‍্যাব। তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে দুটি মামলা চলছে।

নজরদারির সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ফেলো আশিকুর রহমান বেনারকে বলেন, আইএসে যোগ দেওয়া ব্যক্তিরা যাতে ফিরে আসতে না পারে সে জন্য তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে জ​ঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে আফগানিস্তান ফেরত মুজাহিদদের হাত ধরে। যারা আইএসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তারা এখন জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন