ছয় জঙ্গি গ্রেপ্তার, নব্য জেএমবি প্রধানের লাশ হস্তান্তর

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.11.22
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ছয় জঙ্গি গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের’ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নভেম্বর ২২, ২০১৬।
র‍্যাব–১১

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ভাটারা ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে জঙ্গি সন্দেহে মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে তিনজন পুরোনো জেএমবি, দুজন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং একজন হিযবুত তাহরীরের সক্রিয় সদস্য বলে দাবি করেছে তারা।

গত সোমবার সন্ধ্যায় ও গভীর রাতে এবং গতকাল মঙ্গলবার পৃথক অভিযানে এই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি।

এদিকে ঢাকার আশুলিয়ায় র‍্যাবের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবি নেতা আব্দুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহানের লাশ গতকাল মঙ্গলবার আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছে র‍্যাব-৪।

গত ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় র‍্যাবের অভিযান চলাকালে একটি বাসার পাঁচতলা থেকে পড়ে আহত হয় সারোয়ার জাহান। পরে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। র‍্যাবের পক্ষ থেকে ওই দিন তাঁর নাম আবদুর রহমান এবং তাকে নব্য জেএমবির অর্থদাতা বলে পরিচয় দেয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২১ অক্টোবর র‍্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায় আব্দুর রহমানের নাম সারোয়ার জাহান। তার সাংগঠনিক নাম ‘শাইখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ’। সারোয়ারই নব্য জেএমবির প্রধান (আমির)। র‍্যাব এও বলে যে, গত ১৪ মাসে গুলশানের হলি আর্টিজানসহ সারা দেশে যে ২২টি জঙ্গি হামলা হয়েছে সেসব হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে সারোয়ার জাহান।

সারোয়ারের লাশ হস্তান্তর

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সারোয়ারের লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছে র‍্যাব-৪। তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা ছিল। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মুগদা জোনের ডিউটি অফিসার মোস্তফা কামাল লাশ বুঝে নেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চেয়ারম্যান সোহেল মাহমুদ বেনারকে বলেন, “সারোয়ার জাহানের লাশ র‍্যাব-৪ বিকেলে সাড়ে তিনটায় আমাদের কাছ থেকে বুঝে নেয়। এরপর তারাই লাশটি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে।”

সারোয়ারের পরিবারের কেউ তার লাশ শনাক্ত করতে বা বুঝে নিতে আসেননি বলেও জানান তিনি।

র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক খন্দকার লুৎফুল কবির বেনারকে বলেন, “আশুলিয়ার ওই ঘটনায় যে মামলা হয়েছে তার তদন্ত তারাই করছেন। তদন্তের প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের পর তারা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছেন।”

আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মুগদা জোনের ডিউটি অফিসার মোস্তাফা কামাল বেনারকে বলেন, “বিকেল সাড়ে চারটার দিকে লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এ সময় র‍্যাবের লোকজন উপস্থিত ছিল।”

‘পুরোনো জেএমবির’ তিন সদস্য গ্রেপ্তার

ঢাকা মহানগর পুলিশ জানায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীর কাজলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিটের একটি দল অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে; বগুড়া সারিয়াকান্দির রাশেদুর রহমান ওরফে সুমন (২৪), ঢাকার সাভারের শাহিদুল ইসলাম ওরফে শিপন (২৩) ও ভোলার চরফ্যাশনের মো. বাবু হাওলাদার ওরফে হোসেন (২৮)।

পুলিশ বলেছে, তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ১০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউজ পোর্টাল ‘ডিএমপি নিউজে’ বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর ওই তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে যে, তারা পুরোনো জেএমবির সক্রিয় সদস্য। তাঁরা ডাকাতি করার জন্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে বিস্ফোরক দ্রব্য সংগ্রহ করেছিল।

পুলিশের ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিটি ইউনিটের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মো. যায়েদ শাহরিয়ার। বেনারকে তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত তিনজনের নাম ঢাকার তেজগাঁও ও বনানীতে দুটি ডাকাতি এবং নরসিংদীর পাঁচটি ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাঁরা সাভার ও টঙ্গীর দুটি ডাকাতির সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এরা ডাকাতি করে সংগৃহীত অর্থের একটা অংশ সংগঠনের কাজে ব্যয় করত।

এবিটির দুই সদস্য গ্রেপ্তার

সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ২টায় র‍্যাব-১১ সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকা থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। মঙ্গলবার বেলা ২টায় র‍্যাব-১১ এর ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‍্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে কর্নেল কামরুল হাসান এ তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে; ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার আব্বাস আলী (২৭) ও রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার ধুমেরকুঠি এলাকার সাব্বির হোসেন ওরফে রাজু (২২)। র‍্যাব বলছে, জঙ্গি নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীকে কাশিমপুর কারাগারে হামলা করে মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল এদের।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ৭টি জিহাদি বই, সরকার ও গণতন্ত্র বিরোধী ২ সেট লিফলেট ও ২টি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লে কর্নেল কামরুল হাসান বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আব্বাস আলী জিজ্ঞাসাবাদের স্বীকার করেছে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহের নিজ গ্রাম ছনকান্দায় একটি ঘরোয়া ওয়াজ মাহফিলে জসিমউদ্দিন রাহমানিয়ার বয়ানের পর থেকেই তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে সে।

এ ছাড়া একটি গার্মেন্টসে চাকরি করার সুবাদে ফিরোজ ও সেলিম নামে দুজনের সঙ্গে বই লেনদেনের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা হয়। তাদের মাধ্যমেই আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় আব্বাস। পরে তাকে সংগঠনের ঢাকা বিভাগের সমন্বয়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন স্লিপার সেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আব্বাস জানায়, তারা ফেসবুকে ৬-৭ জনের গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এ ছাড়া ই-মেইল ব্যবহার করত। সাব্বির হোসেন ফেসবুকের কিছু গ্রুপের এডমিন ছিল। সে জিহাদি বই সংগ্রহ করে অন্যদের দিয়ে তাদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করত।

কামরুল হাসান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানিয়েছে, তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কাশিমপুর কারাগারে হামলা করে তাদের নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীকে মুক্ত করা। সে জন্য তারা কাশিমপুর এলাকার কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় করেছিল এবং সুযোগ পেলে হামলার অপেক্ষায় ছিল।

হিযবুত তাহরীরের সদস্য গ্রেপ্তার

রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে লিফলেট বিতরণকালে গতকাল সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার নাম মো. ফাহমিদুর রহমান (২৫)। ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল মুত্তাকিন বেনারকে বলেন, লিফলেট বিতরণের সময় তাকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।