Follow us

বিদায়ী বছরে জঙ্গি হামলায় ৪৭ ব্যক্তি এবং অভিযানে ৩৪ জঙ্গি নিহত

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2017-01-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বছরজুড়ে জঙ্গিবাদ দমনে ব্যস্ত ছিল পুলিশ। ২৭ আগস্ট, ২০১৬।
বছরজুড়ে জঙ্গিবাদ দমনে ব্যস্ত ছিল পুলিশ। ২৭ আগস্ট, ২০১৬।
স্টার মেইল

বিদায়ী বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ। ২০১৬ সালে ২৫টি হামলার ঘটনায় ৪৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আর পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছে ৩৪ জঙ্গি।

একের পর এক জঙ্গি হামলা এবং পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযান নিয়ে বছরজুড়ে সরব ছিল গণমাধ্যম। এসব হামলার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) এর সম্পৃক্ততা থাকা বা না থাকার বিষয়টি নিয়েও জল্পনা–কল্পনা ছিল বিস্তর।

বিদায়ী বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে রক্তাক্ত জঙ্গি হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৭ সাল বাংলাদেশের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং। পুলিশের দাবি অনুযায়ী তাদের শক্তি স্তিমিত হয়ে আসলেও তারা এখন আরও সুসংগঠিত ও সুদৃঢ় হামলার দিকে ঝুঁকবে।

গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারের কার্যালয় প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, জঙ্গিদের ইতোমধ্যে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তবে জঙ্গি দমনে পুলিশের তৎপরতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সাল থেকে জঙ্গি হামলার ঘটনা শুরু হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও আনসার আল ইসলামের সদস্যরা এসব হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করছে পুলিশ।

বিভিন্ন ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করে নিলেও বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের সংযোগের বিষয়টি বরাবরই নাকচ করে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের দাবি, দেশে জন্ম নেওয়া জঙ্গিরাই এসব হামলা ঘটিয়েছে।

এ বছর গুলশান হামলার পর পুলিশ নতুন করে ‘নব্য জেএমবির’ নাম সামনে নিয়ে আসে। তাদের দাবি পুরোনো জেএমবি থেকে চলে আসা জঙ্গিরা এটি প্রতিষ্ঠা করেছে। তারাই রক্তক্ষয়ী বিভিন্ন হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। যদিও গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িত ৫ জঙ্গিকে আইএস তাদের সদস্য বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং তাদের বিষয়ে তারা নিজেদের ম্যাগাজিন রুমাইয়াতেও নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

জঙ্গি হামলার ঘটনা বাড়ছে

২০১৩ সালে চারটি জঙ্গি হামলায় নয়জন, ২০১৪ সালে পাঁচটি ঘটনায় তিনজন, ২০১৫ সালে ২৩টি ঘটনায় ২৫ জন এবং ২০১৬ সালে ২৫টি ঘটনায় ৪৭ জন নিহত হয়েছে।

হামলার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিদেশি নাগরিক, হিন্দু পুরোহিত, সাধু, খ্রিস্টান যাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা, পীরের অনুসারী, মাজারের খাদেম, শিয়া অনুসারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি, ব্লগার এবং সমকামীদের অধিকারকর্মী।

গুলশানের হলি আর্টিজানে ১ জুলাই হামলা ও সাত জুলাই শোলাকিয়ায় হামলার পর গত ছয় মাসে আটটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে মোট ২৮ জন ‘নব্য জেএমবির সদস্য নিহত হয়েছে। গুলশান হামলার পর অভিযানে ৫ জন এবং শোলাকিয়ার হামলার পর অভিযানে একজন জঙ্গি নিহত হয়। সর্বমোট নিহত হয় ৩৪ জন জঙ্গি। এর মধ্যে সর্বশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয় গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর আশকোনায়। এ অভিযানের সময় এক নারী আত্মঘাতী এবং এক কিশোর গুলিতে (নিজের বা পুলিশের) নিহত হয়।

নারায়ণগঞ্জে জঙ্গি দমন অভিযান চলার সময় উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। আগস্ট ২৭, ২০১৬।
নারায়ণগঞ্জে জঙ্গি দমন অভিযান চলার সময় উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। আগস্ট ২৭, ২০১৬। স্টার মেইল।
জঙ্গিবাদের বছর

এ বছরের ৭ জানুয়ারি ঝিনাইদহে হোমিও চিকিৎসক ছমির আলী ওরফে খাজাকে (৮২) সদর উপজেলার বেলে খেলা বাজারে তার নিজ হোমিও চিকিৎসালয়ে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আইএস এর দায় স্বীকার করে। এটি এ বছরের প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা।

এরপর একে একে ২৫টি হামলার ঘটনায় নিহত হন ৪৭ জন, আহত হন অন্তত ৪৬জন। ১৮টি ঘটনায়ই আইএস দায় স্বীকার করে, একটিতে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলাম দায় স্বীকার করে। পুলিশ জানায়, গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় নব্য জেএমবি এবং রাজশাহীর তানোরে একটি আমবাগানে পীর শহিদুল্লাহ হত্যার ঘটনায় জেএমবি জড়িত।

১ জুলাই রাজধানীর হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। এ হামলায় ১৭ জন বিদেশি, তিনজন বাংলাদেশি, দুই পুলিশ এবং একজন রেস্তোরাঁ কর্মী নিহত হন। রেস্টুরেন্ট থেকে পালিয়ে আসতে গিয়ে আহত হওয়া আরেক রেস্তোরাঁ কর্মী পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত হন।

এর ঠিক ছয় দিনের মাথায় ৭ জুলাই ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়ায় পুলিশের ওপর জঙ্গিরা হামলা চালায়। তাতে জহিরুল ইসলাম ও আনসারুল হক নামের দুই পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। ঘরের ভেতর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন গৃহবধূ ঝর্ণা রানি ভৌমিক। অন্যদিকে, পুলিশের গুলিতে নিহত হয় আবির রহমান নামের এক জঙ্গি। বছরের সর্বশেষ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে গত ২৩ জুলাই। নরসিংদী সদরে মুদির দোকানি চিত্তরঞ্জন আচার্য্যকে (৪৮) কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, “বিশ্বব্যাপী নৈতিকতা ও নতুন দর্শনের শূন্যতার কারণেই জঙ্গিবাদের আস্ফালন বেড়েছে। বিশেষ করে ষাটের দশকে বাম রাজনীতির উত্থান ও এর প্রসার এ সময়ে এসে স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর সেই জায়গাটি দখল করেছে ধর্মীয় উগ্রবাদ।”

নূর খান আরও বলেন, নতুন কোনো আদর্শিক লড়াই শুরু না করলে জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।

পুলিশের অভিযানে নিহত ৩৪

গুলশানের হলি আর্টিজানে ১ জুলাই হামলার পর গত ছয় মাসে এ নিয়ে আটটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে মোট নিহত হয়েছে ৩৪ জন। এরা সকলেই ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য বলে জানায় পুলিশ।

গুলশান হামলার পর প্রথম অভিযান হয় ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি বাড়িতে। এতে ৯ জন নিহত হন। এরপর ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে আরেকটি জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন নব্য জেএমবির কথিত সামরিক শাখার প্রধান ও হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীসহ ৩ জন। এর পাঁচ দিনের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগরে একটি বাসায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন মেজর (অব) জাহিদুল ইসলাম।

এরপর ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে, ৮ অক্টোবর গাজিপুর, টাঙ্গাইল ও আশুলিয়ায়, সর্বশেষ ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার আশকোনা এলাকায় পুলিশ অভিযান চালায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, জঙ্গিরা এত দিন স্লিপার সেল হিসেবে কাজ করে আসছিল। সংখ্যা কমার কারণে তারা এখন আরও সংগঠিত হবে।

ওই শিক্ষকের মতে, “জঙ্গিরা এখন অল্পসংখ্যক কর্মী দিয়েই মারাত্মক কোনো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা জনবহুল স্থান টার্গেট করতে পারে। বিখ্যাত ব্যক্তি বা জনপ্রিয় কোনো রাজনীতিবিদও তাদের লক্ষ্য হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন