Follow us

এক বছরের পুরোনো মামলায় দুই পাটকল শ্রমিক কারাগারে

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-07-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গ্রেপ্তারকৃত পাটকল শ্রমিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে ঢাকায় গণসংহতি আন্দোলনের বিক্ষোভ সমাবেশ। ০৭ জুলাই ২০২০।
গ্রেপ্তারকৃত পাটকল শ্রমিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে ঢাকায় গণসংহতি আন্দোলনের বিক্ষোভ সমাবেশ। ০৭ জুলাই ২০২০।
[সৌজন্যে: গণসংহতি আন্দোলন]

বন্ধ ঘোষণা করা খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের দুই শ্রমিককে তুলে নিয়ে এক বছর আগের পুরানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। পরে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

এরা হলেন ইস্টার্ন জুট মিলের শ্রমিক ও পাট শিল্প রক্ষা যুব জোটের আহবায়ক অলিয়ার রহমান এবং প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক ও যুব জোটের উপদেষ্টা নূর ইসলাম।

মঙ্গলবার মহানগর হাকিম আদালত পুলিশের করা রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দৌলতপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিনুর রহমান বেনারকে বলেন, আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠিয়েছে।

“২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে খুলনার নতুন রাস্তা মোড়ে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা ও ভাংচুর চালায় শ্রমিকেরা। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই ঘটনায় পুলিশ মামলা দায়ের করে,” শাহিনুর রহমান বলেন।

“সোমবার বিকেলে সেই মামলায় পাটকল শ্রমিক নেতা অলিয়ার রহমান ও নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়,” বলেন তিনি।

তবে এই দুই শ্রমিক নেতার পরিবারের অভিযোগ, গত রোববার রাতে অলিয়ার রহমানকে খান জাহান আলী থানা এলাকার মশিয়ালি এলাকার বাসা থেকে ও নূর ইসলামকে নগরের খালিশপুরের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়।

নুর ইসলামের বড় ছেলে মো. জুয়েল সাংবাদিকদের বলেন, “রোববার রাতে আমাদের বাড়িতে আগুন লেগেছে বলে বাড়ির বাইরে থেকে কিছু লোক চিৎকার করতে থাকে। এ সময় আমার বাবা জানালা দিয়ে উঁকি দিলে তাঁকে দ্রুত নিচে নামতে বলা হয়।”

“বাবা নিচে নামামাত্র কয়েকজন তাঁকে ধরে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। সে সময় বাড়ির বাইরে চারটি সাদা মাইক্রোবাস ও পুলিশের একটি গাড়ি দেখা যায়,” বলেন তিনি।

এদিকে এই দুই পাটকল শ্রমিককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি শুরু থেকে অস্বীকার করলেও প্রায় ২০ ঘণ্টা পরে পুলিশ জানায়, তাঁরা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। পরে ২০১৯ সালে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা ও ভাংচুরের এক মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এ বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) কানাই লাল সরকার সাংবাদিকদের জানান, এ দিন বিকাল পাঁচটার দিকে দৌলতপুর থানা পুলিশ ২০১৯ সালের একটি মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে অলিয়ার রহমান ও নুরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বি.এল কলেজ রোড থেকে আটক করে থানা হেফাজতে নিয়েছে।

তবে শ্রমিক নেতাদের মতে, রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকল বন্ধের প্রতিবাদ ঠেকাতেই এই গ্রেপ্তার।

এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ খুলনা জেলা শাখার সমন্বয়ক জনার্দন দত্ত ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম বলেন, “সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের সামান্যতম বিরোধিতাকেও দমন করতে উঠে পড়ে লেগেছে।”

বিবৃতিতে বলা হয়, “আটক দুই শ্রমিক নেতা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাটের বিরুদ্ধে, বদলি শ্রমিকসহ সব পাটকল শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে লড়াই করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধে সরকারের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবিতে তাঁরা রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন।”

“সেই আন্দোলন দমন করার জন্যই রাতের অন্ধকারে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে,” তাঁদের অভিযোগ।

পাটকলের শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও অবিলম্বে মুক্তি দাবি জানান তাঁরা।

প্রসঙ্গত, চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২৫ টি পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় দেওয়া হবে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিককে।

ঢাকায় বিক্ষোভ

দুই পাটকল শ্রমিক নেতাকে আটকের প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাজধানীতে এক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে গণসংহতি আন্দোলন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়াজিত এই সমাবেশে সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, “এই করোনাকালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটগুলো বন্ধ করে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক এবং আরো ২৫ হাজার বদলি শ্রমিককে কর্মহীন করার নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে সরকার।”

“সরকার বলছে লোকসান হচ্ছে। মিলগুলো খোলা থাকলে প্রতি বছর দুইশ কোটি টাকা লোকসান হয়। অথচ আমরা দেখছি এই সরকারের আমলেই ৪৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে,” বলেন তিনি।

“অথচ বিজেএমসি ও মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও ভুল নীতির কারণে যে লোকসান হচ্ছে তার দায় নিষ্ঠুরভাবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে শ্রমিকদের ওপর,” বলেন জুনায়েদ সাকি।

“যারা পাটকল রক্ষার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে চাইছে তাঁদেরকে ভয় দেখানোর জন্যই নূরুল ইসলাম এবং ওলিয়ার রহমানকে অবৈধ কায়দায় আটক করা হয়েছে,” বলেন তিনি।

সমাবেশ থেকে অনতিবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দেয়ার দাবি করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন