Follow us

আরো সাত বছর কারাদণ্ড পেলেন খালেদা জিয়া

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-10-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাঁর কক্ষ থেকে অন্য একটি বিভাগে নেওয়া হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাঁর কক্ষ থেকে অন্য একটি বিভাগে নেওয়া হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
বেনারনিউজ

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সাত বছরের জেল দিয়েছে আদালত। সোমবার রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডে পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান এই রায় দেন।

এই মামলায় আরও তিনজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন; খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তখনকার একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

আসামিদের প্রত্যেককেই ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ ট্রাস্টের নামে ঢাকার কাকরাইলে থাকা ৪২ কাঠা জমি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেয় আদালত।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা পাওয়ার আট মাসের মাথায় দ্বিতীয় দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এ মামলার বাদী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বেনারকে বলেছেন, “আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। অপরাধ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিলাম, তা পেয়েছি।”

অন্যদিকে রায় প্রত্যাখ্যান করে এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সারা দেশে জেলা সদর ও মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই রায় দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখাই সরকারের উদ্দেশ্য।”

“নিম্ন আদালতে এখন আর মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না,” অভিযোগ করেন ফকরুল।

দণ্ডিতদের মধ্যে হারিছ চৌধুরী মামলার আগে থেকেই পলাতক রয়েছেন। ৭৩ বছর বয়সী খালেদাকে চিকিৎসার জন্য কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কারাবাসে আছেন বাকি দু’জন। হারিছ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।

কারাগারে আদালত

গত ৪ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিভাগ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার সম্পন্ন করতে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করে গেজেট প্রকাশ করে। তখন ওই কারাগারেরই একটি কক্ষে বন্দী ছিলেন খালেদা জিয়া।

আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেটে বলা হয়, “নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালত থেকে নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরোনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নম্বর-৭ কে অস্থায়ী আদালত ঘোষণা করা হয়েছে।”

গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো রাজধানীর পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শেষ দুটি কার্যদিবস ধার্য তারিখে যুক্তিতর্ক পেশ করেনি আসামীপক্ষ।

সোমবার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তল্লাশি ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

রায় প্রদানকালে সরকার পক্ষের আইনজীবী, বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে আদালত চত্তর ভরপুর ছিল।

অনুপস্থিতিতে বিচার

কারারুদ্ধ আসামী জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং মনিরুল ইসলাম খান রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত থাকলেও খালেদা জিয়াকে কারাগারে আনা সম্ভব হয়নি। তাঁর আইনজীবীরাও আদালতে আসেননি।

সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে এসে খালেদা জিয়া আদালতকে বলেন, “বারবার আসতে পারব না। যত ইচ্ছা সাজা দিয়ে দেন।”

কারা কর্তৃপক্ষ খালেদাকে আদালত কক্ষে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই এ মামলার শেষ দিকের কার্যক্রম চালিয়ে নেয় আদালত। আজ রায়ও দেওয়া হয়েছে তার অনুপস্থিতিতে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া আদালতে না আসলে বিচারক মো. আখতারুজ্জামান তাঁকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন এবং তার অনুপস্থিতিতেই মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলবে বলে আদেশে দেন।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। শুনানি শেষে ১৪ অক্টোবর রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন খালেদা।

সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির আপিল বিভাগও খালেদার আবেদনটি খারিজ করে দেন।

সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বেনারকে বলেন, “এ আদেশের ফলে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচার কার্য পরিচালনা এবং রায় প্রদান নিয়ে আইনগত কোনো বিভ্রান্তি রইল না। রায় প্রদানে আর কোনো বাঁধা নেই।”

তবে খালেদার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বেনারকে বলেন, “সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক।”

যেসব অভিযোগে দণ্ড

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুদক।

তদন্ত শেষে ২০১২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলাটিতে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ৩২ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষ তাঁদের জেরা করে। সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হলে দুদকের পক্ষে এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। তবে খালেদার আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন থেকে বিরত থাকেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে আদালত। আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারে সহযোগিতার দায়ে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় হারিছ, জিয়াউল ও মনিরুলকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, “খালেদা জিয়া এবং তাঁর গর্ভজাত দুই সন্তানকে নিয়ে ট্রাস্ট গঠন করায় প্রতীয়মান হয়েছে যে এটি তাঁদের ব্যক্তিগত ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে কোনো দাতব্য কাজ সম্পাদন না করলেও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।”

“ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে টাকা গ্রহণ ও খরচ সংক্রান্ত প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতার অভাব দেখা গেছে। ভবিষ্যতে যাতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ রকম কাজ করতে না পারে সে জন্য আসামিকে সর্বোচ্চ দণ্ড দেওয়া প্রয়োজন,” বলেন বিচারক।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন