Follow us

খালেদা জিয়ার সাজা দ্বিগুণ করে দিলো হাই কোর্ট

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-10-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নেওয়া হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নেওয়া হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর ২০১৮।
নিউজরুম ফটো

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের রায়ে সাজা হয়েছিল পাঁচ বছর, হাইকোর্টের রায়ে সেটা হয়েছে ১০ বছর।

একই সঙ্গে তারেক রহমানসহ মামলার অপর আসামিদের বিচারিক আদালতে দেওয়া ১০ বছর সাজা উচ্চ আদালত বহাল রেখেছে।

খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনে জারি করা রুল ঘোষণা করে মঙ্গলবার এ রায় দেয় হাইকোর্ট।

বিচারপতি এম, ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে। একই সঙ্গে খালাস চেয়ে খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির আপিল খারিজ করে দেয় আদালত।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান মামলাটিতে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। মামলার অপর পাঁচ আসামি খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও তারেক রহমানের ফুফাত ভাই মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৭৩ বছর বয়সী খালেদা বর্তমানে কারা হেফাজতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

কারাবন্দী রয়েছেন কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ এবং পলাতক রয়েছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

এই মামলায় খালেদাসহ কারারুদ্ধ তিন আসামি পৃথক তিনটি এবং দুদক একটি আপিল আবেদন দায়ের করেছিল। পলাতকেরা আপিল করার সুযোগ পাননি।

এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে জিয়া অরফানেজ মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় এ মামলাটি দায়ের করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামক আরেকটি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে সোমবার ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে বিচারিক আদালত।

যুক্তিতর্কে অংশ নেননি খালেদার আইনজীবী

এই মামলায় অধিকতর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সময় বাড়ানোর জন্য খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের এক আবেদন সোমবার খারিজ করে দেয় সুপ্রিমকোর্ট। প্রধান বিচারপতিসহ সাত বিচারকের সর্বোচ্চ বেঞ্চ ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই এ মামলার আপিল নিষ্পত্তির আদেশ বহাল রাখে।

বিকেলে হাইকোর্টে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাতে অংশ নেননি। তবে বাকি আসামিদের পক্ষে তাঁদের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। শুনানি শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে আদালত।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৩১ মিনিটে রায় ঘোষণার সময় প্রথমেই খালেদা জিয়ার পক্ষে খালাস চেয়ে করা আবেদন এবং অন্য আসামিদের সাজা কমানোর দুই আবেদন খারিজ করে আদেশ দেয় আদালত।

পরে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়াতে দুদকের করা রিভিশন আবেদন গ্রহণ করে আদালত এই সাজা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে।

এ সময় আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুদকের পক্ষে অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খানসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। তবে খালেদা জিয়ার পক্ষে সিনিয়র কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এই আপিল আবেদনে তাঁর খালাস চেয়েছেন। অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন চেয়েছেন। আর রাষ্ট্রপক্ষ বিচারিক আদালতের দেওয়া ৫ বছরের সাজাই বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।

নির্বাচনের সুযোগ অনিশ্চিত

হাইকোর্টের রায়ে সাজা বৃদ্ধি পাওয়ায় আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলে মত দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মাহবুবে আলম বেনারকে বলেছেন, “সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন করলেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, এমন নয়। আবেদন করার পর তিনটি অপশন তৈরি হবে। আদালত যদি তাঁদের আবেদন নাকচ করে তাহলে সেখানেই শেষ। তবে আদালত যদি আবেদনটি গ্রহণ করে এবং সাজা স্থগিত বা বাতিল করে দেয় তখন অন্য রকম। এখানে আইনগত প্রশ্নে আমার মত হলো, আপিলেট ডিভিশন সাজা স্থগিত করলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। কারণ সাজার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও তাঁর অপরাধ অপ্রমাণিত হয় না। তখন পর্যন্ত তিনি নৈতিক স্খলনজনীত অপরাধে দণ্ডিত, যতক্ষণ না তিনি খালাস পাচ্ছেন। শুধুমাত্র সাজা বাতিল হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।”

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বেনারকে বলেন, “তিনি নৈতিক স্খলনজনীত অপরাধে দণ্ডিত এবং তাঁর সাজা দুই বছরের অধিক। সুতরাং সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।”

উচ্চ আদালতে সাজা বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “তিনি এই মামলার মূল আসামি। অন্য আসামিদের সাজা বেশি হলে তাঁর কেমন করে কম হবে? এতে ন্যায় বিচারের প্রশ্নে খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হতো।”

“আমরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছিলাম। সবকিছু বিবেচনা করে আদালত ১০ বছর সাজা দিয়েছে, এতে আমরা সন্তুষ্ট,” বলেন খুরশীদ আলম।

তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বেনারকে বলেছেন, “আমরা সুবিচারের জন্য আপিলেট ডিভিশনে আবেদন করব। আশা করি আমরা সুবিচার পাব এবং আদালত তাঁর সাজা স্থগিত করবেন। সর্বোচ্চ আদালত সাজা স্থগিত করলে নির্বাচন করতেও কোনো বাঁধা থাকবে না।”

আদালতে বিক্ষোভ

উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। প্রতিবাদে তাঁরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।

সঙ্গে আগামী বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘বেআইনিভাবে’ বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা বাড়ানোর প্রতিবাদে বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদালতের উভয় বিভাগে কর্মবিরতি পালন করা হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন