Follow us

কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার পুনঃতদন্ত দাবি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-06-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ বছর স্মরণে ঢাকায় আয়োজিত আলোচনা সভা। জুন ১২, ২০১৭।
কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ বছর স্মরণে ঢাকায় আয়োজিত আলোচনা সভা। জুন ১২, ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ বছর পরে ওই ঘটনায় করা মামলার পুনঃতদন্ত দাবি করেছে বিভিন্ন আদিবাসী ও মানবাধিকার সংগঠন। ‘উচ্চ পর্যায়ের’ তদন্ত দাবি জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তাঁরা।

প্রসঙ্গত, ২১ বছর আগে জুন মাসের ১২ তারিখের প্রথম প্রহরে নিজ বাসা থেকে অপহৃত হন কল্পনা। অপহরণের সময় কল্পনার বড় ভাই কালন্দি কুমার চাকমা তিনজন অপহরণকারীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের নাম উল্লেখ করে মামলাও করেন কালন্দি চাকমা।

তবে ১৯৯৬ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত ওই মামলার ৩৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করেছে পুলিশ। গত বছর সেপ্টেম্বর সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রাঙামাটি জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান অপহরণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

তবে বিশ বছর পরের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য অপহরণের সঙ্গে জড়িত নয়। তা ছাড়া তাঁরা নিশ্চিতও হতে পারেনি কল্পনা চাকমা আদৌ বেঁচে আছে কিনা।

তদন্তের এমন অবস্থার সমালোচনা করে হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করে বলেছেন, পুলিশ কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার চায় না।

তাঁরা ওই মামলার ‘উচ্চ পর্যায়ের’ তদন্ত দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৭ জুন নিহত চার পাহাড়ি ছাত্র হত্যারও তদন্ত দাবি করেছেন উইমেন্স ফেডারেশন নেতৃবৃন্দ।

এদিকে “আদালত এখনো এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি করেননি বলে বেনারকে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাঈদ তারিকুল হাসান।

তিনি বলেন, “আমি তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাইনি; আমি তাই জমা দিয়েছি। কল্পনা চাকমা বেঁচে আছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি।”

উনচল্লিশ বার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করে সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, “আমি জানি না কেন পরিবর্তন করা হয়েছে।”

১৯৯৬ সালের ১২ জুন প্রথম প্রহরে (রাত একটার দিকে) ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারীরা হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার লাল্যাঘোনার বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

সেদিনের স্মৃতি মনে করে কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দি চাকমা বেনারকে বলেন, “তখন আমাদের এলাকায় কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। আনুমানিক রাত একটার দিকে ১০-১২ জন অস্ত্রসহ আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা আমাদের সবাইকে চোখ বেঁধে আলাদা করে।”

“আমি টর্চের আলোতে তিনজনকে চিনতে পারি। একজন লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস এবং দু’জন বিজিবি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহম্মদ। আমি মামলার এজাহারে তাদের নাম উল্লেখ করেছি। কিন্তু পুলিশ তাদের পায় না। আমরা কি বিচার পাব?,” বলেন তিনি।

কালিন্দি চাকমা বলেন, “আমি পুলিশের তদন্ত প্রত্যাখ্যান করি। আমরা একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে কল্পনা অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক চন্দ্রা ত্রিপুরা বেনারকে বলেন, “আমরা কল্পনা চাকমা অপহরণের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত। কল্পনাকে অপহরণ করার কারণ, তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে পাহাড়ি নারীদের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন।”

“তাকে রাজনৈতিক কারণেই অপহরণ করা হয়। এ কারণেই পুলিশ তদন্তে আন্তরিক নয়। ৩৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা কি আন্তরিকতার প্রমাণ?,” প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ত্রিপুরা বলেন, “তাই আমরা চাই, পুলিশ নয় সরকারের ‘উচ্চ পর্যায়ের’ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক।”

এর আগে ওই ঘটনা তদন্তে বিচারপতি আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। তবে সেই তদন্ত আজও প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন চন্দ্রা ত্রিপুরা।

কল্পনা চাকমার অপহরণের ২১তম বার্ষিকীতে সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি অডিটোরিয়ামে এক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ইনডিজেনাস উইমেন্স নেটওয়ার্ক।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করি’র প্রধান খুশী কবির, সঞ্জীব দ্রং প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারাহ হোসেন বলেন, কল্পনা চাকমা সবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করেছেন। তাই কণ্ঠ রোধ করার জন্য তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। কল্পনার ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার জন্য সবার অংশগ্রহণ দরকার। এ সময় তিনি উপস্থিত সবাইকে পরবর্তী শুনানির দিন (১৮ জুলাই) আদালতে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন