কক্সবাজারে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে এক পরিবারের পাঁচ শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু

জেসমিন পাপড়ি ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2021-07-28
Share
কক্সবাজারে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে এক পরিবারের পাঁচ শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু ভারী বৃষ্টিতে পানিবন্দি কক্সবাজার টেকনাফ উপজেলার হ্নীলার একটি এলাকা। ২৮ জুলাই ২০২১।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

ছয় সন্তান নিয়ে রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের বিলিজার পাড়ার কৃষক সৈয়দ আলম ও রেহানা দম্পতি। বুধবার সকালে উঠে দেখেন পাঁচ সন্তানই বেঁচে নেই। ভারী বৃষ্টিতে ওইদিন ভোর রাতে তাঁদের ঘরের ওপর ধসে পড়েছে পাহাড়।

এই দম্পতির পাঁচ সন্তানেরই ঘুমন্ত অবস্থায় মাটি চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে। বেঁচে যাওয়া এক শিশু সন্তানসহ স্বামী–স্ত্রী গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন হাসপাতালে।

এক পরিবারের ওই পাঁচজনসহ বুধবার কক্সবাজারে মোট ১৪ জন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে মারা গেছেন ছয় জন।

গত কয়েক দিন ধরে কক্সবাজারে ভারী বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। একইসঙ্গে বেড়েছে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা।

“বুধবার পাহাড় ধস ও পানিতে ভেসে কক্সবাজার জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে,” বেনারকে বলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মামুনুর রশিদ। 

জেলার টেকনাফ, উখিয়া ও সদ্য ঘোষিত ঈদগাঁও উপজেলায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। 

টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ চৌধুরী বেনারকে বলেন, বুধবার ভোররাত একটা থেকে দুইটার মধ্যে পাহাড় ধসে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। এরা হচ্ছে; আবদুর শুক্কুর (১৮), মো. জুবাইর (১৬), আবদুল লতিফ (৭), কহিনুর আক্তার (১৪) ও জায়নুফা আক্তার (১০)। তারা সবাই স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল। 

সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার টেকনাফ প্রধান সড়কের হ্নীলা বাজার থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পশ্চিমে পাহাড়ের পাদদেশে ছৈয়দ আলমের বাড়িটি দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। চারদিকে বাঁশের বেড়া, ওপরে টিনের চালা। পাহাড় ধসে পড়ায় বাড়ির বেশিরভাগ অংশ মাটি নিচে দেবে গেছে, শুধু চালাটি দেখা যাচ্ছে। এর নিচ থেকেই ছৈয়দ আলমের নিহত সন্তানদের উদ্ধার করা হয়। 

সন্তান হারানো ছৈয়দ আলম বেনারকে জানান, প্রতিদিনের মতো কাজ শেষ করে রাত ৯টার দিকে ঘুমাতে যান তাঁরা। বাড়িতে উত্তর দক্ষিণে দুইটা কক্ষ। উত্তরের কক্ষে ছৈয়দ আলম ও তাঁর স্ত্রী রেহেনা বেগম শিশু মরিয়মকে নিয়ে শুয়ে পড়েন। অপর কক্ষে অন্যান্য সন্তানেরা ঘুমাতে যায়।

“ঘুমাতে যাওয়ার আগে ছেলেদের সাথে বাড়ির পাশের সবজি খেতের পরিচর্যার পরামর্শ ও পরিকল্পনা করি। কিন্তু সকাল না হতেই আমার পাঁচ সন্তান মাটি চাপা পড়ে মারা যায়। আমিও প্রায় পঙ্গু। স্ত্রী ও আমাদের বেঁচে যাওয়া ছোট্ট শিশুটি হাসপাতালে,” বলছিলেন তিনি। 

বুধবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিনাল পারভেজ ও টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী। তাঁরা ছৈয়দ আলমকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। সেই সঙ্গে তাঁর ঘর তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

জেলা প্রশাসক জানান, “অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জেলার ৪১টি ইউনিয়ন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫১ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। তাদের ত্রাণসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হচ্ছে।”

“পাশাপাশি আমরা নিহত প্রতি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দিয়েছি। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে।” 

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান জানান, “পানিবন্দি ও পাহাড়ে বসবাসরত ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে ও হচ্ছে। আট হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্যরা এসব কাজে সহযোগিতা করছেন।” 

তিনি বলেন, “কক্সবাজারে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অত্যন্ত বেশি। খরচ বাঁচাতে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ সরকারি জায়গা দখল করে পাহাড় কেটে বসবাস করেন। ফলে বর্ষার দিনগুলোতে এই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন তাঁরা।”

তবে কক্সবাজারের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, “সরকারি সংস্থাগুলো নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলেই এমন ঘটনা ঘটছে।”

পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন চলতে থাকলে আগামীতে আরও বড়ো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। 

আরো নয় জনের মৃত্যু

বন্যার পানিতে ডুবে কক্সবাজারের উখিয়ায় তিন জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুমে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

নিহতরা হলেন; উখিয়া উপজেলার আবদুর রহমান (৪৫), আলী আকবর (৪০) ও মো. রুবেল (২২)। ঘুমধুম ইউনিয়নের শীলপাড়া গ্রামের আশীষ বড়ুয়া (১৬) ও আবদুর রহিম (২৮) পানিতে ডুবে মারা গেছেন। 

এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীতে পাহাড় ধসে মোর্শেদা বেগম নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে উপজেলার সিপাহী পাড়ায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান মহেশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল হাই। 

এদিকে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলায় খালে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে তিন কিশোর। বুধবার বিকেলে এই ৩ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এরা হলো; মোহাম্মদ শাহাজাহান (১৪), আব্দুল্লাহ (১৫) ও ফারুক (১৩)। 

১২ হাজার রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে

এর আগে গত দুই দিনে ভূমি ধস ও বন্যায় কক্সবাজারে চার শিশুসহ ছয় রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ছয় রোহিঙ্গা শরণার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে, ১২ হাজারের বেশি শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আনুমানিক ২,৫০০ আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। 

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন বেনারকে বলেন, “ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্তসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১২ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।” 

তাঁদের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত করে জরুরি সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

“বৃষ্টিপাত এভাবে চলতে থাকলে যারা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় রয়েছে তাদেরও সরিয়ে নেয়া হবে,” বলেন সামছু-দ্দৌজা নয়ন। 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার সেনা অভিযান থেকে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নতুন পুরোনো মিলে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর মধ্য থেকে কয়েক দফায় ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর দ্বীপ ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন