Follow us

জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলার ৩৫ বার পেছানো অভিযোগপত্র ‘প্রায় চূড়ান্ত’

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-04-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সমকামীদের অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী আসাদুল্লাহকে টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৬ জানুয়ারি ২০১৯।
সমকামীদের অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী আসাদুল্লাহকে টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৬ জানুয়ারি ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যা মামলার অভিযোগপত্র তিন বছরে ৩৫ বার পেছানোর পর এখন তা দাখিলের জন্য প্রায় চূড়ান্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এতে মোট আট জঙ্গিকে আসামি করা হয়েছে। যদিও তদন্তের ধীর গতি নিয়ে হতাশ নিহতদের স্বজনরা।

“নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জঙ্গিকে আসামি করে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করা হচ্ছে,” বেনারকে জানান তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বুধবার বেনারকে বলেন, তিনি এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কথা বলতে চান না।

তদন্তকারীদের ব্যর্থতায় ইতিমধ্যে মোট ৩৫ বার অভিযোগপত্র দাখিল পেছাতে বাধ্য হয়েছে আদালত। সর্বশেষ গত ১৬ এপ্রিল ঢাকা মহানগর হাকিম সাইফুজ্জামান শরীফ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৪ মে নতুন দিন ধার্য করেছেন।

এ প্রসঙ্গে হতাশা প্রকাশ করে হত্যা মামলার বাদী জুলহাজের ভাই মিনহাজ মান্নান ইমন বেনারকে বলেন, “যে ঘটনার পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন) বারাক ওবামা বিচারের দাবি জানিয়েছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন, সেই মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ ৩৫ বার পেছানোর ঘটনা হতাশাজনক।”

তদন্তকারীরা এ পর্যন্ত জুলহাজের পরিবারের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ করেননি জানিয়ে তিনি বলেন, “জুলহাজ-তনয় হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার কেউ আমার বা পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।”

ইমনের মতে, বাদীর সাথে একবারও আলাপ না করে তৈরি করা অভিযোগপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাবে।

অন্যদিকে তনয়ের মামা মাহফুজুর রহমান খান বেনারকে বলেন, “কয়েকদিন আগে তদন্তকারীরা আমার কাছে এসে বলেছিলেন মামলার বাদীর সাথে তাঁদের যোগাযোগ আছে।” তদন্তের ধীর গতি নিয়ে হতাশ হলেও পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে চান তিনি।

“পুলিশ আমাদের বলেছে, কয়েকজনকে তারা ধরতে পেরেছে। যাদের মধ্যে সরাসরি সম্পৃক্তরাও আছে। তবে সবার নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আটককৃতদের বয়ানের ভিত্তিতেই তাঁরা অভিযোগপত্র দাখিল করবে,” বলেন মাহফুজ।

জুলহাজ মান্নান (বামে) ও মাহবুব রাব্বী তনয়। ফাইল ছবি। [বেনারনিউজ]
জুলহাজ মান্নান (বামে) ও মাহবুব রাব্বী তনয়। ফাইল ছবি। [বেনারনিউজ]
২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগান লেক সার্কাসে জুলহাজের বাসায় খুন হন জুলহাজ-তনয়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই দায় স্বীকার করেছিল আনসার আল ইসলাম (পুরোনো নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম), যারা নিজেদের আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা বলে দাবি করে।

জুলহাজ ছিলেন মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির ঢাকা অফিসের কর্মকর্তা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র তনয় যুক্ত ছিলেন লোক নাট্যদলের সঙ্গে।

তারা দুজনেই ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের প্রথম সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার বিষয়ক পত্রিকা ‘রূপবান’ প্রকাশ ও প্রচারের সাথে জড়িত ছিলেন।

ঘটনার রাতেই জুলহাজের ভাই ইমন অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া পুলিশের ওপর হামলা ও অস্ত্র পাওয়ার ঘটনা আরেকটি মামলা করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শমীম আহমেদ।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, পার্সেল ডেলিভারির কথা বলে কয়েকজন যুবক বাসায় ঢুকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করে। জুলহাজের মরদেহ বেডরুমে এবং তনয়ের মরদেহ ড্রইংরুমে পাওয়া যায়। তাঁদের চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুনিরা পালানোর সময় বাড়ির দারোয়ান পারভেজ মোল্লা এবং কলাবাগান এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মমতাজউদ্দিনও হামলার শিকার হন। তবে মমতাজ দুর্বৃত্তের একজনকে জাপটে ধরে একটি ব্যাগ রেখে দিতে সক্ষম হন।

ওই ব্যাগে থাকা একটি পিস্তল, একটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও মুঠোফোনের সূত্র ধরেই তদন্ত এগিয়েছে।

রূপবানের কারণেই হত্যাকাণ্ড

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, সমকামিতা নিয়ে পত্রিকা ‘রূপবান’ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আনসার আল ইসলাম জুলহাজকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়। মেজর জিয়ার সমন্বয়, পরিকল্পনা ও নির্দেশে জঙ্গি নেতা সেলিমের তত্ত্বাবধানে ১২ জঙ্গি ‘হত্যা মিশনে’ অংশ নেন।

মেজর জিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অভিযুক্তরা হচ্ছেন- আনসার আল ইসলামের নেতা মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন, শেখ আবদুল্লাহ জোবায়ের, আরাফাত শামস ওরফে সাজ্জাদ, ফয়জুল ওরফে আসাদুল্লাহ, হায়দার জোনায়েদ, আকরাম ওরফে আবির আদনান ও আফনান ওরফে অনিক।

এদের মধ্যে কারান্তরীণ সায়মন, আবদুল্লাহ, শামস ও আসাদুল্লাহ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

হত্যাকারীদের প্রশিক্ষক জঙ্গি নেতা সেলিম ওরফে আল হাদী, হাসান, কবিরুল ও আলীমের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা না পাওয়ায় তাঁরা গ্রেপ্তার হলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া খুনিদের ফেলে যাওয়া মুঠোফোনের কল তালিকার সূত্রে আটক জঙ্গি রাশেদ উদ্দিন ভূঞা ওরফে রায়হান ওরফে টিপুও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁকে মামলার সাক্ষী করা হচ্ছে।

ডিএমপি গত ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট আনসার আল ইসলামের অন্যতম শীর্ষ নেতা সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২ কে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এদের মধ্যে সেলিমকে এখন পর্যন্ত শনাক্তই করতে পারেনি পুলিশ।

‘চাপা আতঙ্ক থেকে যাবে’

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পারিবারিকভাবে কোনো আয়োজন থাকবে না বলে জানিয়েছে জুলহাজ ও তনয়ের পরিবার। তবে বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রতি বছরের মতো এবারও ঘরোয়াভাবে এই মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে।

একাধিক ‘এলজিবিটি অ্যাক্টিভিস্ট’ বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তবে আলোচিত হিজড়া নাদিরা খানম মনে করেন, জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও বিচার না হলে যৌন সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারের দাবিতে সোচ্চার থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক থেকে যাবে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিগত একাদশ সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সংগ্রহ করে আলোচনায় আসা এই তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক বেনারকে বলেন, “এলজিবিটি এবং আমাদের হিজড়া কমিউনিটির সবাই জুলহাজ-তনয় হত্যার বিচার চায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন