Follow us

মংলায় সমাহিত হতে ইতালি থেকে আসছে ফাদার রিগনের মরদেহ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-10-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ফাদার মারিনো রিগন।
ফাদার মারিনো রিগন।
মারিনো রিগন এর ফেসবুক পেজ

ফাদার মারিনো রিগন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি না হলেও জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশে, অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে, গড়ে তুলেছেন স্কুল ও হাসপাতাল। আর মৃত্যুর আগে বলে গেছেন তাঁকে যেন সমাহিত করা হয় তাঁর দীর্ঘ দিনের কর্মস্থল মংলায়।

জন্মসূত্রে ইতালির নাগরিক ফাদার মারিনোর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর এক বছর পর তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আসছে বাগেরহাটের মংলায় সমাহিত হতে।

আগামী ২১ অক্টোবর ইতালি থেকে ফাদার রিগনের মরদেহ বাংলাদেশে আসছে বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস।

তিনি বলেন, “ফাদার রিগনের মরদেহ ইতালি থেকে রোববার ঢাকায় আসবে। এরপর ঢাকা থেকে তাঁর লাশ হেলিকপ্টারযোগে মংলায় আনা হবে।”

গত বছরের ২০ অক্টোবর ৯২ বছর বয়সে ইতালিতে মারা যান ফাদার মারিনো রিগন। মৃত্যুর আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন, মংলাতেই যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই উপজেলায় তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন।

তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা দুই দেশের সরকারের মাধ্যমে লাশ আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। এতে সময় লেগে যায় ঠিক এক বছর। দীর্ঘ এই সময় ধরে রিগনের লাশ ইতালিতে হিমঘরে রয়েছে।

ফাদার মারিনো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে সরকার তাঁকে বাংলাদেশের বন্ধু উপাধি দেয়, তাঁকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক নাগরিকত্বও।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফাদারের মরদেহ রবিবার ভোর পাঁচটার দিকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসবে।

সেখান থেকে সকালে হেলিকপ্টারে লাশ নেওয়া হবে মোংলায়। হেলিকপ্টার নামবে মংলার শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল সাড়ে নয়টায় ফাদার রিগনের মরদেহ নেওয়া হবে মংলা উপজেলা পরিষদের মাঠে।

মংলা উপজেলা কর্মকর্তারা জানান, দুই ঘণ্টা সেখানে রাখার পর মরদেহ নেওয়া হবে ফাদার রিগনের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেন্ট পলস হাসপাতালে।

এরপর তাঁকে শেলাবুনিয়ার সেন্ট পলস গীর্জার সামনে গার্ড অব অনার প্রদান করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হবে।

জেলা প্রশাসক তপন বিশ্বাস বলেন, “তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁকে যেন মংলার মাটিতে সমাহিত করা হয়। আমরা সেই প্রস্তুতি নিয়েছি।”

তিনি বলেন, “ফাদার রিগন তার জীবনের বড় অংশ মংলায় কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য অনেক কাজ করেছেন। তিনি সেখানে অসম্ভব জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তি।”

ফাদার রিগনের জীবন

১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভিচেঞ্চায় জন্মগ্রহণ করেন ফাদার রিগন। ১৯৫৩ সালের শুরুর দিকে তিনি বাংলাদেশে ধর্ম প্রচারে আসেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় অবস্থান করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা, অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা প্রদান করেন ফাদার রিগন। স্বাধীনতার পর মংলার শেলাবুনিয়ায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন তিনি।

মংলার সেন্ট পল স্কুলের সাবেক ছাত্র আলম রায়হান বেনারকে বলেন, “ফাদার রিগন মংলায় গড়ে তোলেন স্কুল ও হাসপাতাল। কাজ করেছেন, শিক্ষার বিস্তারে, দারিদ্র বিমোচনে ও নারীর ক্ষমতায়নে। ‍উনি দলমত নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।”

ফাদার রিগন বাংলা ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। দীর্ঘ সময়ে মংলায় অবস্থানকালে তিনি ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিসহ ৪০টি কাব্যগ্রন্থ, লালন সাঁইয়ের গান, জসীম উদ্দীনের নকশীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও এ দেশের খ্যাতিমান কবিদের অসংখ্য কবিতা।

২০১০ সালের পর থেকে ফাদার রিগন মোংলায় চার্চের বাইরে যেতে পারতেন না। ২০১২ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর দুই বছর পর ২০১৪ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর ভাই এসে তাঁকে ইতালিতে নিয়ে যান।

তবে তিনি শর্ত জুড়ে দেন ইতালিতে মৃত্যু হলে তাঁর লাশ বাগেরহাটের মোংলার সেন্ট পলস গীর্জার পাশে সমাহিত করতে হবে।

বাংলাদেশ খ্রিস্টান সমিতির সভাপতি নির্মল রোজারিও বেনারকে বলেন, “ফাদার রিগন মংলা তথা বাংলাদেশের মানুষকে খুব ভালবাসতেন। তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিকের মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর অবদান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মংলার মানুষ মনে রাখবে।”

ইতালি থেকে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে এনে সমাহিত করার জন্য খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

মংলা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের বেনারকে বলেন, ফাদার রিগন বাগেরহাটে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সহায়তা করতেন। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা এনে সাধারণ মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন।

আবু তাহের বলেন, “তাঁর অন্যতম বড় অবদান হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়, তাদের তিনি ভারত থেকে ফিরিয়ে আনেন।”

“ফাদার রিগন খ্রিস্টান হলেও তাঁর কাছে সব মানুষ ছিল সমান,” এই শিক্ষাই তিনি মংলা তথা গোটা দেশবাসীর রেখে গেছেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন