Follow us

দশ সপ্তায় নিখোঁজ আট: আছেন ব্যবসায়ী, ছাত্র, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2017-11-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাসের সন্ধান দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএফইউজে এবং ডিইউজে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে উৎপলের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। ১ নভেম্বর ২০১৭।
নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাসের সন্ধান দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএফইউজে এবং ডিইউজে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে উৎপলের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। ১ নভেম্বর ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

গত দশ সপ্তায় ঢাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত আটজন। পুলিশের পক্ষ থেকে নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে চেষ্টার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যত কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ মানবাধিকার কর্মীদের।

গত ২৭ অক্টোবর থেকে নতুন গঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মী আশিক ঘোষের খোঁজ মিলছে না। ১০ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ আছেন সাংবাদিক উৎপল দাস। তাবলিগ জামাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন আরাফাত রহমান (২৪)।

গত ১০ সপ্তাহের মধ্যে আরাফাত, মিঠুন, আশিক ও উৎ​পলের মতো আটজন ঢাকা শহর থেকে নিখোঁজ হয়েছেন।

এছাড়া গত ২২ থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ আরও চার ব্যক্তি হলেন; বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায় এবং কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ।

অপহরণ বা নিখোঁজের ঘটনায় সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় সন্তুষ্ট নয় বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠন বা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশে গুম, খুন, অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গুমের সংস্কৃতি চালু হলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে না। আর যে ধরনের পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে, সেসবের ব্যাপারে জনমনে আস্থাহীনতা রয়েছে।”

অপহরণকারীদের চিহ্নিত করতে রাষ্ট্রের ক্রমাগত ব্যর্থতার ফলে মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর সাংবাদিকেরা র‍্যাব ও পুলিশের সঙ্গে যতবার যোগাযোগ করছেন, ততবারই প্রায় একইরকম বক্তব্য পেয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলছেন, নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছে পুলিশ।

অন্যদিকে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদকিদের বলেন, তাঁদের উদ্ধারে র‍্যাব চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

আরাফাতকে ফেরত চান বাবা

তাবলিগ জামাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরাফাত রহমান (২৪) নামে এক যুবক। গত ৭ অক্টোবর তিনি বাসা থেকে আমিনবাজারে তাবলিগে যাওয়ার জন্য বের হন। এরপর আর ফেরেননি।

আরাফাতের বাবা মমিনুল হক বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্রাব) কার্যালয়ে গিয়ে এই অভিযোগ জানান।

আরাফাত তাঁর স্ত্রী ও কন্যাসহ নীলফামারীর সৈয়দপুরে থাকতেন। তাঁর আড়াই মাস বয়সী একটি মেয়ে আছে। সৈয়দপুর থেকে মাঝেমধ্যেই বাবা-মাকে দেখতে ঢাকায় আসতেন ওই যুবক। সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্ত্রী-কন্যাসহ ঢাকায় আসেন।

“৭ অক্টোবর আরাফাত আমিনবাজারে তাবলিগে যাওয়ার কথা বলে বসিলা এলাকার বাসা থেকে বের হয়। কিন্তু এখনো ফেরেনি। তাঁকে অনেক খোঁজাখুজি করা হয়েছে। কিন্তু সন্ধান পাইনি,” সাংবাদিকদের জানান মমিনুল হক।

আরাফাতের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে ১০ অক্টোবর মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করেন মমিনুল হক।

মিঠুন ও আশিকের খোঁজ মিলছে না

নতুন গঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মী আশিক ঘোষকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, গত ২৭ অক্টোবর রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি রাজধানীর ফরাশগঞ্জ থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ওই দুজন নিখোঁজ রয়েছেন।

মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী সুমনা চৌধুরী গত মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, মিঠুনের সঙ্গে নিখোঁজ সহকর্মী আশিক ঘোষ দলের যুব পার্টির সভাপতি। সুমনা চৌধুরী এ দুজনের সন্ধান পাওয়ার আকুতি জানিয়ে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সুমনা চৌধুরী বলেন, ওই দুজনের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে সূত্রাপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে বলেছেন, এ ব্যাপারে জিডি নেওয়া সম্ভব নয়। স্বামী নিখোঁজের পর থেকে তিনি এবং তাঁর স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম আশরাফ উদ্দিন বেনারকে বলেন, মিঠুন চৌধুরীর পরিবারের কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি। এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।

সাংবাদিক উৎপল দাস

গত ১০ অক্টোবর নিজের কর্মক্ষেত্র পূর্বপশ্চিম বিডি ডট নিউজ কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সাংবাদিক উৎপল দাস।

ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়

নিখোঁজ আছেন ব্যবসায়ী ও রুশ অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়। তাঁর স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি করে কেবল এটুকু জানতে চান, অনিরুদ্ধ বেঁচে আছেন কি না।

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়কে ২৭ আগস্ট ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসযোগে তুলে নেওয়া হয়। ওই ভিডিও ফুটেজ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে আছে। তারপরও পুলিশ তাঁর স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন অনিরুদ্ধর স্ত্রী।

সাদাত, ইশরাক ও আমিনুর

বনানী উড়ালসড়কের নিচ থেকে সন্তানের সামনেই সাদাপোশাকে একদল অপহরণকারী ২২ আগস্ট সাদাত আহমেদকে তুলে নিয়ে যায়। সাদাত আহমেদের স্ত্রী এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি।

কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ ২৬ আগস্ট থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। ধানমন্ডির স্টার কাবাবে বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি, এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। জুনে ছুটি কাটাতে দেশে আসেন ইশরাক। গত সেপ্টেম্বরে তাঁর ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।

ইশরাকের বাবা মো. জামালউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “এমন একটা দিন নেই যে আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাইনি। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও যাই। কিন্তু কেউ খোঁজ দিতে পারছে না।"

গত ২৭ আগস্ট রাতে কল্যাণ পার্টির অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় নিখোঁজ হন দলটির মহাসচিব আমিনুর রহমান। এ ঘটনায় পল্টন থানায় আমিনুর রহমানের ভাই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অকৃতদার আমিনুরের অসুস্থ মা ছেলের ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাঁর সন্ধান চেয়ে পরিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে। কল্যাণ পার্টির পক্ষ থেকে কয়েকদফা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খানের মতে, “বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে। এই সময়ে যদি এ ধরনের প্রবণতা বেড়ে চলে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভয়–ভীতি আছে তা আরও বাড়বে। এ ধরনের ভয় বাড়তে থাকলে গণতন্ত্র, নির্বাচন, ভোট বা জনমত—কিছুই কাজে আসবে না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন