Follow us

বৈরুত বিস্ফোরণ: মারা গেছেন অন্তত চার বাংলাদেশি, নৌবাহিনী সদস্যসহ আহত ৯৯

শরীফ খিয়াম ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-08-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বন্দরের একটি গুদামে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে ঘটা বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বৈরুত। ৪ আগস্ট ২০২০।
বন্দরের একটি গুদামে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে ঘটা বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বৈরুত। ৪ আগস্ট ২০২০।
[এপি]

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননের রাজধানী বৈরুতে মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে অন্তত চার বাংলাদেশি নিহত এবং কমপক্ষে ৯৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন জাতিসংঘ শান্তিমিশনে অংশ নেওয়া নৌবাহিনীর সদস্য, ৭৮ জন বেসামরিক প্রবাসী।

লেবাবনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আল মুস্তাহিদুর রহমান বুধবার বেনারকে জানান, আহতদের মধ্যে নৌবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো হারুন উর রশীদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

“গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত মেডিকেল সেন্টারে (এইউবিএমসি) ভর্তি করা হয়েছে। তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। এখনও শঙ্কামুক্ত হননি,” বেনারকে টেলিফোনে বলেন রাষ্ট্রদূত।

নৌবাহিনীর অন্যান্য আহত সদস্যরা শঙ্কামুক্ত উল্লেখ করে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ইউনাইটেড নেশন ইনট্রিম ফোর্স ইন লেবাননের (ইউএনআইএফআইএল) তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁদের হামুদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ইউএনআইএফআইএল-এর মেরিটাইম টাস্কফোর্সের (এমটিএফ) কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রবাহী কর্ভেট (যুদ্ধ জাহাজ) বানৌজা বিজয়ও এই বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বৈরুত বন্দরে নোঙর করে রাখা জাহাজটি “বিস্ফোরণ স্থল হতে মাত্র দুইশ গজ দূরে অবস্থান করছিল,” বলে নৌবাহনীর একটি ফেসবুক পেইজ থেকে জানানো হয়।

ঘটনার পরপরই রাষ্ট্রদূত জাহাঙ্গীর সরেজমিনে নৌবাহিনীর জাহাজটি পরিদর্শন করেন জানিয়ে আইএসপিআর বলেছে, “বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে।”

সেখানে নৌবাহিনীর ১১০ সদস্যে ছিলেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।

নিহত চার বাংলাদেশি

বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব আবদুল্লাহ আল মামুন বুধবার বেনারকে বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত চারজন বেসামরিক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জেনেছি।”

আরো কয়েকজনের মৃত্যুর খবর তাঁরা যাচাই করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নিহতরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেহেদি হাসান ও রাসেল মিয়া, মাদারীপুরের মোহাম্মদ মিজান এবং কুমিল্লার রেজাউল করিম।

মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে উল্লেখ করে দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, “স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে বিস্ফোরণে মোট ৭৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশির আহত হওয়ার তথ্য জানতে পেরেছি আমরা।”

বৈরুতের যেসব স্থান বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব এলাকায় আনুমানিক তিন থেকে চার হাজার বাংলাদেশি থাকেন বলেও তিনি জানান। দূতাবাসের ফেসবুক পেইজে একটি হেল্পলাইন নম্বর দিয়ে হতাহতের খবর জানাতে বলা হয়েছে প্রবাসীদের।

এর আগে এক টুইট বার্তায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, “বাংলাদেশ লেবাননকে যে কোনোভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত।”

ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করার জন্যও অনুরোধ করেন তিনি।

নিহতদের পরিবারে আহাজারি

চার ভাইবোনোর মধ্যে সবার বড়ো নিহত মেহেদি হাসান।

তাঁর ফুফাতো বোন তাজরীন আক্তার হামিলা বেনারকে জানান, ছয় বছর আগে তাঁর বাবা তাজুল ইসলাম বাহরাইনে থাকাকালীন সময়ে মেহেদি লেবানন চলে যান। যে কারণে প্রায় এক যুগ ধরে পিতাপুত্রের দেখা হয়নি।

“এটা খুবই মর্মান্তিক। কারণ মেহেদি দুই বছর ধরে দেশে আসার চেষ্টা করেও পারছিল না। এ নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ও মামার (মেহেদির বাবা) সাথে মোবাইলে কথা বলেছে সে। রাতেই আমরা বিস্ফোরণের খবর পাই,” বলেন তিনি।

২০১৭ সালে লেবাননে যাওয়া মিজানুর রহমানের মামা বজলুর রহমান বেনারকে জানান, ‍তিনিও ছিলেন ভাইবোনের মধ্যে বড়ো। বিস্ফোরণের খবর পেয়ে তাঁর শাশুড়ি এবং মামা শ্বশুর রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে খুঁজেছেন। সকালে হাসপাতালে লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে।

“মিজান ছিল তার শারীরিক প্রতিবন্ধী ও রোগগ্রস্ত মায়ের একমাত্র অবলম্বন,” উল্লেখ করে বজলুর বলেন, “আমরা সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই, তাঁর লাশটা যেন বাংলাদেশে মাটি দিতে পারি।”

প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ রাজু বেনারকে বলেন, “আমি বৈরুতের ডাউনটাউনে থাকি। আমার এখান থেকে মাত্র ২০ মিনিট লাগে বন্দরে যেতে। সন্ধ্যা ছয়টা সাত মিনিটে সময় ভূমিকম্প অনুভব করি। তখন আমি একটি সুপার মার্কেটে কাজ করছি। ভূমিকম্পটি এক থেকে দেড় মিনিট ছিল।

“এর পরপরই বিরাট একটা শব্দ হলো। আমাদের সুপার মার্কেটের সমস্ত কিছু চুরমার হতে লাগল,” বলেন তিনি।

বৈরুতের ১৬ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি শহর বেইত মেরি শহরের মোহাম্মদ আল আমিন বেনারকে বলেন, “এখান থেকেও বিস্ফোরণের ধোয়া স্পষ্ট দেখা গেছে।”

প্রায় একই দূরত্বের জুমা এলাকায় বসবাসকারী মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম বেনারকে জানান, সেখানকার সবগুলো ভবনের কাচ ভেঙে গেছে।

একই এলাকায় বসবাসকারী মোহাম্মদ রিপন বেনারকে বলেন, “বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ আগেই বৈরুতের আশরাফিতে কাজ করে এমন দুই বাংলাদেশি বন্ধুর সাথে মোবাইলে কথা হয়েছিল আমার। ঘটনার পর থেকে তাঁদের মোবাইল বন্ধ পাচ্ছি।”

বৈরুত দূতাবাসের প্রথম সচিব আবদুল্লাহ আল মামুনও বেনারকে বলেন, “এটা এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।”

দূতাবাসের কর্মকর্তা ও প্রবাসীরা জানান, বর্তমানে প্রায় দেড়লক্ষাধিক বাংলাদেশি লেবাননে আছেন। যাদের প্রায় ৮০ শতাংশ করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বেকার। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ১১ মাস ধরে কেউ দেশে টাকাও পাঠাতে পারছেন না। এরই মধ্যে এমন ঘটনায় তাঁরা খুবই আতঙ্কিত।

“আমরা বাংলাদেশ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছি,” বেনারকে বলেন বৈরুতে অবস্থানকারী রাজু।

বৈরুত বন্দরের একটি গুদামে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য থেকে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব।

ওই গুদামে দু হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুদ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কোনো নাশকতামূলক ঘটনা নয়।

ওই বিস্ফোরণে অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন লেবাননের রেড ক্রস কর্মকর্তারা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন