Follow us

দেশে পৌঁছালেন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবার দায়ে মালয়েশিয়ায় আটক রায়হান

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-08-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রায়হান কবিরকে বিমানে তুলে দিতে নিয়ে যাচ্ছেন দেশটির অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা। ২১ আগস্ট ২০২০।
বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রায়হান কবিরকে বিমানে তুলে দিতে নিয়ে যাচ্ছেন দেশটির অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা। ২১ আগস্ট ২০২০।
[এস মাহফুজ/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রবাসী শ্রমিকদের সাথে মালয়েশিয়া সরকারের ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণের বিষয়ে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ঘটনায় আটক বাংলাদেশি তরুণ রায়হান কবিরকে (২৫) দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সে দেশের সরকার।

মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে রায়হান ঢাকার হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নারায়ণগঞ্জে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন রাত আড়াইটার দিকে।

“বিমানবন্দর থেকে ছেলেকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে বাসার দিকে রওনা হয়েছি,” জানিয়ে রায়হানের বাবা শাহ্ আলম টেলিফোনে বেনারকে বলেন, “রায়হান ভালো আছে। তাকে দেখে খুশি হয়েছি।”

এর আগে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক খায়রুল জামি দাউদ শুক্রবার কুয়ালালামপুরে সাংবাদিকদের জানান, রায়হান কবিরকে শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত নয়টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকাগামী মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে তুলে দেয়া হচ্ছে।

অভিবাসন সূত্র জানায়, রায়হানকে বহনকারী বিমানটি কুয়ালালামপুর থেকে স্থানীয় সময় রাত ১১টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

দুদিন আগে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাস তাঁর টিকেটের ব্যবস্থা করে।

বিমানে ভ্রমণের জন্য তাঁর করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয় বলে জানিয়েছেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, রায়হান কবিরের রিমান্ড শেষ হওয়ায় তাঁকে ৩১ আগস্টের পরিবর্তে শুক্রবার ফেরত পাঠানো হয়।

গত ৩ জুলাই কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন আল-জাজিরায় ‘১০১-ইস্ট’ নামক ডকুমেন্টারিতে বাংলাদেশি অভিবাসী রায়হান কবিরের একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। ২৫ মিনিটের ওই ডকুমেন্টারিতে করোনাভাইরাস মহামারিতে অভিবাসী কর্মীদের প্রতি মালয়েশিয়া সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেন রায়হান কবির।

বক্তব্যটি প্রচার হলে, তাঁকে খুঁজতে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রায় এক মাস তিনি মালয়েশিয়ার অভিভাসন বিভাগে আটক ছিলেন।

তাঁকে রিমান্ডে নেয়া হয়। তবে তিনি তাঁর দেয়া বক্তব্যে অটল থাকেন। রিমান্ড শেষ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি মালয়েশিয়া সরকার।

বাংলাদেশের ব্র্যাকসহ মোট ২১টি দেশি–বিদেশি বেসরকারি সংস্থা রায়হান কবিরের পক্ষে মালয়েশিয়ায় আইনজীবী নিয়োগ করে। এসব সংস্থা তাঁকে নিরাপদে ও সম্মানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ শুক্রবার বেনারকে বলেন, “রায়হান কবিরের বিষয়টি নিষ্পত্তিতে মালয়েশিয়া সরকার আন্তরিক ছিল। নিরাপদে এবং সম্মানের সাথে তাঁর দেশে ফিরে আসার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হলো। গণমাধ্যম মূলত বিষয়টিকে ফলাও করে প্রচার করেছে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চমৎকার। রায়হান কবিরের ব্যাপারটি দুদেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।”

রায়হান কবিরের বাবা শাহ্ আলম শুক্রবার বেনারকে বলেন, “ব্র্যাকের অভিবাসন প্রধান আমাকে শুক্রবার সন্ধ্যায় জানিয়েছিলেন যে মালয়েশিয়া সরকার আজ রায়হান কবিরকে ফেরত পাঠাচ্ছে। ভালো লাগছে যে, অবশেষে ছেলে বাড়ি ফিরে এসেছে।”

তিনি বলেন, “আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। সত্য কথা বলার কারণে সে এবং আমাদের ভুগতে হলো।”

নারায়ণগঞ্জে নিজের বাড়িতে মা রাশেদা বেগম ও বাবা শাহ আলমের সাথে রায়হান কবির। [সৌজন্যে: রায়হানের পরিবার]
নারায়ণগঞ্জে নিজের বাড়িতে মা রাশেদা বেগম ও বাবা শাহ আলমের সাথে রায়হান কবির। [সৌজন্যে: রায়হানের পরিবার]
ব্র্যাকের অভিবাসন প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “নীরবতা ভঙ্গ করে মালয়েশিয়ায় নিষ্পেষিত সকল অভিবাসী কর্মীর কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন রায়হান কবির। তিনি কোনো অপরাধ করেননি; সংবাদমাধ্যমে কথা বলা কোনো অপরাধ নয়। তাঁকে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে।”

তবে শুক্রবার রাতে শরিফুল হাসান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন, “ভালো লাগছে রায়হান এখন কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে। তবে খারাপ লাগছে হাতে হাতকড়া দেখে। পৃথিবীর কোনো আইনেই অভিভাসীদের হাতে হাতকড়া পরানো যায় না।”

রায়হানের বাবা শাহ আলম নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি এলাকায় একটি নিট কারখানায় কাজ করেন, বসবাস করেন বন্দরের গ্রামের বাড়িতে।

তিনি জানান, ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মালয়েশিয়ায় আইন বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা জানান রায়হান।

ধার-কর্জ করে ছেলেকে কুয়ালালামপুর পাঠান তিনি।

রায়হান “ছোটবেলা থেকেই ঠোঁটকাটা স্বভাবের। সত্য কথা বলে দেবেই,” বলেন শাহ আলাম।

তিনি বলেন, “আমি অনেকবার তাকে বলেছি, বাবা এত সত্য কথা বলতে হয় না। তখন সে বলত ‘তুমি যদি অন্যের জন্য ভালো কিছু করতে চাও তাহলে তোমাকে সত্য কথা বলতে হবে, অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে।”

“ছেলেকে নিয়ে আমি গর্বিত। আমার ছেলে অন্যের জন্য কথা বলেছে, নিজের স্বার্থের জন্য বলেনি,” বলেন শাহ আলম।

রায়হান মালয়েশিয়াতে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করে পরিবারেও কিছু টাকা পাঠাতেন বলে জানান তাঁর বাবা। তবে আইন পড়ার জন্য সে দেশে গেলেও তিনি বাণিজ্য বিষয়ে পড়াশোনা করে ২০১৯ সালে স্নাতক করেন।

শাহ আলম জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে কুয়ালালামপুরে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে পূর্ণকালীন চাকুরি পান রায়হান।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মালেয়িশয়া থেকে নোয়াহ লী ও নিশা ডেভিড।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন