Follow us

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই প্রবাস ফেরত ৮৩ শ্রমিক কারাগারে

শরীফ খিয়াম ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-09-01
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে নেওয়া হচ্ছে ৮৩ প্রবাসী শ্রমিককে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২০।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে নেওয়া হচ্ছে ৮৩ প্রবাসী শ্রমিককে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২০।
[বেনারনিউজ]

প্রবাস থেকে ফেরা আরও ৮৩ জনকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটক করেছে পুলিশ।

দেশে ফিরে করোনাভাইরাসের কারণে দুই সপ্তাহের প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গনিরোধ কাটানোর পর মঙ্গলবার সকালে তাঁদের আটক করে আদালতে হাজির করা হলে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দেবদাশ চন্দ্র অধিকারী তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এদের ৮১ জন ভিয়েতনাম ফেরত এবং দুইজন কাতার ফেরত শ্রমিক। এদের সাথে আসা অন্য ২৫ জনকে সঙ্গনিরোধের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়, “এরা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। ভবিষ্যতে তাঁদের অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। জনগণের জানমালরে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।”

রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ি এলাকার একটি বাসায় সঙ্গনিরোধে ছিলেন তাঁরা।

“সন্দেহভাজন হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৫৪ ধারায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে,” বেনারকে বলেন তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরুল মুত্তাকিন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বেনারকে বলেন, “সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাঁদের যেভাবে জেলে পাঠানো হলো তা খুবই দুঃখজনক। করোনা মহামারির মধ্যে এ নিয়ে তিন শতাধিক অভিবাসী শ্রমিক এভাবে আটক হলেন।”গত জুলাইর প্রথম দিকে একইভাবে গ্রেপ্তার হওয়া ২১৯ জন প্রবাসীও জেল হাজতে রয়েছেন। ওসি মুত্তাকিন বলেন, “তাঁদের ব্যাপারে এখনও তদন্ত চলছে।”

তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বেনারকে বলেন, “অন্যায়ভাবে কোনো প্রবাসীকে আটকে রাখা হবে না। তদন্ত শেষে নিরাপরাধ সবাই ছাড়া পাবেন।”

এর মধ্যে ভিয়েতনাম ফেরত শ্রমিকরা শুরু থেকেই প্রতারণার শিকার বলেও দাবি করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান।

“প্রতারিত হয়ে নিজ দেশের সরকারের সাহায্য চাইতে গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রথমে বলা হলো তাঁরা দূতাবাস দখলের চেষ্টা করেছেন। এরপর বলা হয়েছে তাঁরা সেখানে ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। অথচ পরে দেখা গেছে এগুলো সত্য নয়,” বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ৬ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, অবৈধভাবে ভিয়েতনামে যাওয়া কিছু বাংলাদেশি ওই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন দখল করার চেষ্টা করেছেন।

তবে শরিফুলে দাবি, “রিক্রটিং এজেন্সির মাধ্যমে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিয়ম-কানুন মেনেই তাঁরা ভিয়েতনামে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে আশ্বাস অনুযায়ী কাজ পায়নি।”

এ ঘটনার শুরু থেকেই জড়িত এজেন্সি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্ত রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর ওপরই দোষ চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সফল না হয়েই তাঁদের ৫৪ ধারায় আটক করা হলো।

তবে ভিয়েতনাম কাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী ইমরান আহমদ। বেনারকে তিনি বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দায়ীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

দিশেহারা স্বজনেরা

গত ডিসেম্বরে বিয়ে করেন নারায়ণগঞ্জে মেহেদী সর্দার (২১)। এর কিছুদিন পরই রিক্রুটিং এজেন্সির দালালদের প্রলোভনে পড়ে ভিয়েতনামে কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বউয়ের গহনা স্বর্ণকারের দোকানে জামানত রেখে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশ ছাড়েন।

প্রতারিত হয়ে ১৮ আগস্ট দেশে ফেরার পর প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গনিরোধ শেষে মঙ্গলবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল মেহেদীর।

“সকালে ফোন করে বললেন, পুলিশ নাকি তাদের অনেককে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হবে—এটুকুই শুধু বললেন,” বেনারকে জানান মেহেদীর স্ত্রী সানজিদা আক্তার মিম (১৮)।

“কিছু করার মতো কোনো আত্বীয়-স্বজন আমাদের নেই। এখন আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না,” বলেন তিনি।

ভিয়েতনাম ফেরত শহীদুল বাশার অমিকের (২০) মা নাজমা আক্তার কুমিল্লা থেকে মোবাইলে বেনারকে বলেন, “আজ তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানতাম। তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু কোনো খবর নেই।”

চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তিন লাখ ৯০ হাজার টাকা খরচ করে ছেলেকে ভিয়েতনামে পাঠানোর কথা জানান তিনি। তিনি জানান, অমিক ভিয়েতনামে থাকাকালে তাঁর খাওয়ার খরচের জন্যও দালালরা কয়েক দফায় আরো ২০ হাজার টাকা নিয়েছে।

এ ছাড়া মোবাইল কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন, যা তাঁর ছেলের হাতে পৌঁছায়নি। এখন ছেলের খোঁজ নিতে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না।

মালয়েশিয়া বলে ভিয়েতনামে

আড়াই বছর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়া জন্য দালালদের টাকা দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের তরুণ শেখ (২১)। অবশেষে সাত মাস আগে তারা ভিয়েতনামের ভিসা ধরিয়ে দেয়। তাঁর গ্রামের সাতজন এভাবে গিয়েছিলেন, সবাই ফিরে এসেছেন।

সঙ্গনিরোধ শেষে ঝিনাইদহ যাওয়ার পথে বেনারকে তরুণ বলেন, “ভিয়েতনাম থেকে আমরা মোট ১০৬ জন একসাথে ফিরেছি। এর মধ্যে মাত্র ২৫ জনকে বাড়ি যেতে দেওয়া হয়েছে।”

“যাদের জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাঁদের ব্যাপারে আমরা পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ওদের দোষটা কী? তারা কিছুই বললেন না,” বলেন তিনি।'

হালের গরু ও জমি বিক্রির পাশাপাশি ঋণ করে চার লাখ টাকা যোগাড় করে দালালকে দিয়েছিলেন তরুণ। “সরকার যদি দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে আমাদের টাকাটা আদায় করে দেয়, তাহলেই শুধু ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব,” বলেন তিনি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে (১ এপ্রিল থেকে ৩০ আগস্ট) দেশে ফিরেছেন ৯৫ হাজার ৬২ জন প্রবাসী।

বিশ্বের ২৬টি দেশ ফিরে আসা এই প্রবাসীদের মধ্যে মধ্যে ৮৮ হাজার ৪০৬ জন পুরুষ এবং ছয় হাজার ৬৫৬ জন নারী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন