Follow us

যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় আটকে পড়া ১৪৮ বাংলাদেশি ফিরেছেন

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-01-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আইওএম কর্মীদের সাথে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নথিতে সই করছেন লিবিয়া থেকে ফেরত আসা এক বাংলাদেশি। ২৯ জানুয়ারি ২০২০।
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আইওএম কর্মীদের সাথে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নথিতে সই করছেন লিবিয়া থেকে ফেরত আসা এক বাংলাদেশি। ২৯ জানুয়ারি ২০২০।
[সৌজন্যে: আইওএম]

চলমান যুদ্ধাবস্থার মুখে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন ১৪৮ বাংলাদেশি। একটি ভাড়া করা বিশেষ উড়োজাহাজে বুধবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তাঁরা। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

সংস্থাটি জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে দেশে ফেরার জন্য লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেন অনেক বাংলাদেশি। দূতাবাসের সহায়তায় আইওএমের খরচে ও তত্ত্বাবধানে দেশে ফেরত আনা হয় তাঁদের।

আইওএম, বাংলাদেশের মুখপাত্র শরীফুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “এখনো অনেক বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে তাঁদের সংখ্যা অথবা কবে তাঁদের ফেরত আনা যাবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”

সেখানকার পরিস্থিতি বোঝাতে তিনি বলেন, “এই ফ্লাইট আসার কথা ছিল গত ২৩ জানুয়ারি। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তায় তাঁদের অবশেষে আজ ফেরত আনা গেল। লিবিয়ায় এয়ারপোর্ট বন্ধ। ভাড়া করা বিমানে তাঁদের আনতে হয়েছে।”

দুই মাস আগে আরও ১৬০ জনকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত আনা হয় বলে জানান শরীফুল।

আইওএম জানায়, ফিরে আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন যুদ্ধে আহত, সমুদ্রপথে ইউরোপ যেতে ব্যর্থ এবং লিবিয়ার জেলে বন্দী থাকা অভিবাসীরা।

শরীফুল বলেন, বুধবার ফেরত আসা ১৪৮ জনের মধ্যে আটজন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাঁদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, ফেরত আসাদের মধ্যে ত্রিপোলিতে যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত ২ জনসহ ৯ জন অসুস্থ বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া ওই ফ্লাইটে ত্রিপোলির যুদ্ধে নিহত চারজন প্রবাসীসহ মোট পাঁচজন বাংলাদেশির মরদেহও দেশে এসেছে।

দূতাবাস জানায়, ত্রিপোলির যুদ্ধ কবলিত এলাকায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ইতিপূর্বে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে দেশে ফিরতে তাঁদের রেজিস্ট্রেশন করা হয়। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দূতাবাস লিবিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁদের বহির্গমন ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় অনুমতির ব্যবস্থা করে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ত্রিপোলির মেতিগা বিমানবন্দরে বারংবার বোমা হামলার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ বিমানটি ত্রিপোলি হতে ২২০ কিলোমিটার দূরবর্তী মিসরাতা বিমানবন্দর হতে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।

‘জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছি’

যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করা লিবিয়া থেকে নিরাপদে দেশে ফিরতে পেরে সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ফেরত আসা বাংলাদেশিরা।

রাজবাড়ি জেলার বাসিন্দা মো. তুহিন মোল্লা বেনারকে বলেন, “২০১২ সালে সুদান থেকে লিবিয়ায় গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতাম। ২০১৪ থেকেই সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়।”

“রাজধানী ত্রিপোলি থেকে অনেক দূরে আমি ছিলাম। এত দিন নিরাপদে থাকতে পারলেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এখন চারদিকে গোলাগুলির শব্দ। প্রতিটি মুহূর্তে জীবন হারানোর শঙ্কা। সেখানে কাজও নেই। এ জন্য আমি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই।”

বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করে দেশে ফিরতে প্রায় আড়াই মাসের মতো সময় লেগেছে বলে জানান তুহিন মোল্লা।

দেশে ফেরার অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “টাকা আয় করে পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে বিদেশ গিয়েছিলাম। এখন জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছি এটাই বড়। যারা ফেরত এনেছেন তারা বিরাট উপকার করেছেন।”

উল্লেখ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সাল থেকে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারিভাবে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো বন্ধ থাকার পরেও গত কয়েক বছর ধরে অনেক বাংলাদেশি দেশটিতে প্রবেশ করেছেন। মূলত ইউরোপে প্রবেশের ট্রানজিট হিসেবে এই দেশকে ব্যবহার করে থাকেন তাঁরা।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বাংলাদেশি এখনো লিবিয়া যাচ্ছেন। ইউরোপে প্রবেশ করার ট্রানজিট হিসেবে দেশটিকে ব্যবহার করছেন।

“এ ছাড়া লিবিয়ায় যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, দেশটির নানা গ্রুপের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত ৪-৫ বছর ধরে দেশটিতে বৈধভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছে সরকার। ফলে এই সময়ে সেখানে যারা গেছেন তাঁরা অবৈধভাবে গেছেন,” বলেন তিনি।

শরিফুল জানান, ব্র্যাকের প্রত্যাশা প্রোগ্রামের আওতায় গত দুই বছরে প্রায় সাতশ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরার পর সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যারা লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন।

অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া আইনগতভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এসব বিষয়ে সচেতন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমানে লিবিয়াতে প্রায় ১৫-২০ হাজারের মতো বাংলাদেশি থাকতে পারেন বলে জানান শরিফুল হাসান।

দেশে ফেরত আসা ঝিনাইদহের মো. আকবরের বরাত দিয়ে আইওএম জানায়, তিনি গ্রামের দালাল ধরে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে বেতন খুবই কম ছিল। তবু কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যে কারখানায় তিনি কাজ করতেন সেখানে হঠাৎ বিমান হামলায় ৪ বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হন।

“সে এক ভায়াবহ অভিজ্ঞতা। মনে হলো অল্পের জন্য জীবনটা বাঁচল। সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে আসব,” বলেন আকবর।

এরপর বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করে আইওএম এর সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন আকবর।

লিবিয়ার প্রতিকূল অবস্থা অব্যাহত থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে আইওএম সর্বদা তৎপর বলে জানান আইওএম বাংলাদেশের চিফ আব মিশন গিওর্গি গিগাওরি।

দেশে পৌঁছানো ১৪৮ জনের স্বাস্থ্যপরীক্ষাসহ বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে ফেরার জন্য অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে বিবিৃতিতে জানায় আইওএম।

“আগামীতে এই অভিবাসীদের অর্থনৈতিক সহযোগিতাও করবে আইওএম, যাতে তাঁরা বাংলাদেশে আয় করে জীবন চালাতে পারেন,” বলা হয় ওই বিবৃতিতে।

আইওএম জানায়, ইউরোপিয় ইউনিয়নের অর্থায়নে বাংলদেশ ও লিবিয়া কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার চারশোর বেশি বাংলাদেশিকে দেশে ফিরতে সহযোগিতা করছে তারা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন