Follow us

লিবিয়ায় আতঙ্কে কয়েক হাজার বাংলাদেশি

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-05-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ত্রিপোলির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত কয়েকজন বাংলাদেশি। ২৯ মে ২০২০।
ত্রিপোলির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত কয়েকজন বাংলাদেশি। ২৯ মে ২০২০।
[সৌজন্যে: লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস]

লিবিয়ায় বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ১১ জন আহত হওয়ার পরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দেশটিতে অবস্থান করা কয়েক হাজার বাংলাদেশি। দুষ্কৃতকারীরা আবারও হামলা চালাতে পারে বলে শঙ্কা তাঁদের।

লিবিয়ার একটি পেট্রোলিয়াম কারখানায় কর্মরত বাংলাদেশি কর্মী মো. আসলাম বেনারকে বলেন, “যেকোনো সময় বাংলাদেশিদের ওপর হামলা হতে পারে। আমরা এখানে আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছি। কিন্তু আমরা অসহায়, নিরাপত্তা চাইলেও পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।”

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বেনারকে বলেন, “লিবিয়াতে বর্তমানে বৈধ–অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজারের মতো বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেও সেখানকার দূতাবাস তাঁদের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছে।”

গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত মিজদাহ শহরে বন্দুক হামলায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন নিহত হন, বাকি চারজন আফ্রিকান নাগরিক। হামলায় আহত ১১ জনই বাংলাদেশি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার বলা হয়, ১৫ দিন আগে বেনগাজী থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কাজের সন্ধানে মানবপাচারকারীরা ত্রিপোলিতে নিয়ে আসার পথে ৩৮ জন বাংলাদেশি মিজদাহ শহরের কাছে লিবিয়ান মিলিশিয়া বাহিনীর একদল দুষ্কৃতকারীর হাতে জিম্মি হন।

ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একজন বাংলাদেশির বরাত দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে জিম্মিকারীকর্তৃক অমানবিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে অপহৃত ব্যক্তিবর্গ দ্বারা মূল অপহরণকারী লিবিয়ান নিহত হয়।”

এর প্রতিশোধ নিতে লিবিয়ান মিলিশিয়া বাহিনী তাঁদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও আরো ১১ জন আহত হন বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যের সঙ্গে বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যের কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। লিবিয়া সরকারের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, নিহত পাচারকারীর আত্মীয়স্বজনদের প্রতিশোধমূলক হামলায় এসব বাংলাদেশি হতাহত হন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা বিষয়ক অনুবিভাগের মহাপরিচালক মালেকা বেগম বেনারকে বলেন, “ওই ঘটনার সময় উপস্থিত ও বেঁচে যাওয়া একজন বাংলাদেশীর তথ্য এটি, ঘটনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক বর্ণনা পাওয়ার আরো কোনো উপায় নেই। তদন্তের পর বিস্তারিত কিছু পেলে তা জানানো হবে।”

এদিকে ঘটনার তদন্তসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার, যথাযথ শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।

শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বেনারকে বলেন, “হত্যার শিকার ২৬ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং পুরো ঘটনার তদন্তসহ এর সাথে জড়িতদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও লিবিয়া কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ দূতাবাস।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিজদাহের সুরক্ষা বিভাগকে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।

বেনগাজীর বাংলাদেশ কমিউনিটির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বেনারকে বলেন, “যুদ্ধ চলার কারণে লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। ফলে সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা লিবিয়ানদের হামলার ভয়ে দিন পার করছেন।”

তিনি জানান, ১১ জন আহত বাংলাদেশিকে যখন মিজদাহ শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তখনও সেখানে পাচারকারী চক্র হামলা চালায়। তবে কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। পরে সেখান থেকে ওই বাংলাদেশিদের ত্রিপলির জিনহামেরির একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেনারকে বলেন, ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশি দূতাবাসকে তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি বর্তমানে কোথায় রয়েছেন তা জানা যায়নি।

আহতদের মধ্যে গুরতর পাঁচজন

আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বেনারকে বলেন, “১১ জনের মধ্যে ছয়জন শঙ্কামুক্ত। তবে পাঁচজন গুরুতর আহত। এদের তিনজনের শরীর থেকে গুলি বের করতে অস্ত্রপচার হয়েছে। বাকি দুজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মিজদাহ শহরে এখন যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান এবং এ অঞ্চলটি এখন দুটি শক্তিশালী পক্ষের যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে। কিছুদিন আগে ত্রিপোলি ভিত্তিক এবং জাতিসংঘ সমর্থিত জিএনএ সরকার এই অঞ্চলটি দখল করে নিলেও জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব ভিত্তিক সরকারি বাহিনী দুই দিন আগেও শহরটিতে বোমাবর্ষণ করেছে।

ত্রিপোলি ভিত্তিক সরকারের এ অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। এমনকি ত্রিপোলি শহরেও বিরোধীপক্ষ মাঝেমাঝে বোমাবর্ষণ করে থাকে।

দু’টি শক্তিশালী পক্ষ যুদ্ধরত থাকায় সেখানকার জীবনযাত্রা স্বাভাবিক নয়। এ কারণে অধিকাংশ দেশ তাদের দূতাবাস তিউনিসিয়ায় স্থানান্তর করেছে। বাংলাদেশসহ তিনটি দেশ দূতাবাসের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

ইউরোপ যাওয়ার আশা

আহতদের একজন মাদারিপুরের সম্রাট খালাসী। তিনি ত্রিপলিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর বড় ভাই সেলিম খালাসী বেনারকে বলেন, “১৩ মাস আগে সম্রাট সাড়ে চার লাখ খরচ করে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় যায়। তবে দালালেরা তাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে জানতে পারি তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছে।”

“সম্প্রতি জানতে পারি লিবিয়ার বাংলাদেশি দালালেরা তাকে ইতালি পৌঁছে দেবে। এজন্য বেনগাজী থেকে তারা রওনা দিয়েছে,” বলেন তিনি।

“কদিন আগে ভাই জানায় বাংলাদেশি দালালরা তাদের লিবিয়ার পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করেছে। সম্রাটের কাছে তারা ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু ১০ হাজার টাকা দেওয়ারও ক্ষমতা আমাদের নেই,” বলেন সেলিম।

তিনি বলেন, “সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে আমার মোবাইলে সম্রাটের একটি ভয়েস ম্যাসেজ পাই। যাতে সে বলছে পাচারকারীরা তাদের খুব মারধর করছে হয়তো মেরে ফেলবে। এরপর থেকেই তার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বেনারকে বলেন, বাংলাদেশিরা ইউরোপে যাওয়ার লোভে দালালদের প্রায় ১০-১২ হাজার ডলার করে দিয়েছেন।

বিচার চায় সিজিসিএম

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলোর জোট সিভিল সোসাইটি ফর গ্লোবাল কমিটমেন্টস অন মাইগ্রেশন (সিজিসিএম)।

শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানায়, লিবিয়ার পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর নামে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের জিম্মি ও নিপীড়ন করছে। সর্বশেষ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশিরা। প্রয়োজনে বাংলোদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নেওয়ার আহবানও জানায় সিজিসিএম।

বিবৃতিতে বলা হয়, লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলার সুযোগ নিয়ে গত প্রায় এক দশক ধরে মানবপাচারকারী চক্র সেখানে সক্রিয়। এই চক্রকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে খুঁজে বের করতে বিভিন্ন দেশকে প্রয়োজনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে বিশ লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। এতে ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলেই শুধু ৬৯৩ জন বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে আটক হয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো গত পাঁচ বছর ধরেই বন্ধ। তারপরেও কী করে এতো লোক বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া যাচ্ছে সেই ঘটনার তদন্তের দাবি জানায় সিজিসিএম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন