Follow us

জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দূতাবাস, উপাসনালয়সহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-07-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় এলাকাটি ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ২৯ এপ্রিল ২০১৯।
ঢাকার একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় এলাকাটি ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ২৯ এপ্রিল ২০১৯।
[এএফপি]

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দেশব্যাপী নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। বিমানবন্দর, পুলিশের স্থাপনা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস এবং বিভিন্ন উপাসনালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে দেশের পুলিশের ইউনিটগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসা ও এতিমখানার ওপর। পাশপাশি বিভিন্ন শহর ও শহরতলি এলাকার ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী ইতিমধ্যেই নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাতের চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। নতুন ভাড়াটের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।”

তবে বিষয়টি “খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার মতো না, আবার উদাসীন হওয়ার মতোও পরিস্থিতি না,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন সিটিটিসির উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “গত বছরের ঠিক এই সময়ে জঙ্গিরা কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছিল। কিন্তু অব্যাহত অভিযানের কারণে এ বছর তারা এখনো তেমন কিছু করতে পারেনি। হামলার ইচ্ছা তাদের সব সময়েই থাকে। কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় তারা পেরে উঠছে না।”

সারা দেশের পুলিশকে সতর্ক করে চিঠি

পুলিশ বলছে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) কথিত বেঙ্গল উলায়াত নামে একটি শাখা ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে- এমন তথ্যের প্রেক্ষিতে এই সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর গত ১৯ জুলাই সারা দেশের পুলিশের ইউনিটপ্রধানদের চিঠি পাঠিয়েছে বলে বেনারকে নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম। এ চিঠির একটি কপি বেনারের হাতে এসেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনায় জানা যায় যে, তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) আসন্ন ইদুল আজহাকে সামনে রেখে ‘বেঙ্গল উলায়াত’ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণত কোনো সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমেই উলায়াত ঘোষণা করা হয়।”

“এমতাবস্থায় ‘নব্য জেএমবি’সহ আইএস মতাদর্শের দেশীয় অনুসারী জঙ্গি সংগঠনগুলো যেকোনো সময়ে সন্ত্রাসী হামলা (আত্মঘাতী) পরিচালনাসহ বোমা হামলার মাধ্যমে বিভিন্ন নাশকতামূলক বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারে,” চিঠিতে বলা হয়।

পুলিশের অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বেনারকে বলেন, “বিশ্বব্যাপী জঙ্গিরা আরবি জিলহজ মাসে হামলাকে অনেক পুণ্যের কাজ হিসেবে দেখে। তাই এই মাস ঘিরে হামলার আশঙ্কা থেকে বরাবরই পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।”

তাঁর মতে, “বেঙ্গল উলায়াত বলতে সংগঠনটির বাংলাদেশ শাখা বোঝানো হয়েছে। হঠাৎ করে নিজেদের প্রতি গণমাধ্যমসহ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং সদস্যদের উদ্দীপ্ত করতে তারা বিভিন্ন সময় এ ধরনের শাখার ঘোষণা দেয়।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে জঙ্গিরা গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বড় ধরনের কোনো হামলা ঘটাতে পারেনি। তবে তারা বসে নেই। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ আছে এমন দেশীয় জঙ্গিরা অত্যন্ত তৎপর।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) বেনারকে বলেন, “দেশীয় জঙ্গিদের সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর আদর্শের কিছুটা মিল রয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ থাকতে পারে।”

“তবে দেশীয় জঙ্গিদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে। সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা নানাভাবে তৎপর। যার কারণে বছর তিনেক জঙ্গিরা বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটাতে পারেনি। যদিও বিক্ষিপ্তভাবে চেষ্টা করেছে,” বলেন তিনি।

মোহাম্মদ আলী মনে করেন, ‘বেঙ্গল উলায়াতের’ সাথে আইএসের সরাসরি যোগাযোগ নেই। নিজেরে অবস্থান জানাতে দেশীয় জঙ্গিরাই নতুন এই নামে আত্মপ্রকাশ করছে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময় নাম পরিবর্তন করে থাকে। কিন্তু তাদের মূল জায়গা একটি। তাঁরা বাংলাদেশে ধর্ম বা শরিয়ার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। আবার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।”

যেভাবে হামলা হতে পারে

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে সকাল ৬টা থেকে ৮টা বা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে হামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

এতে বলা হয়, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পুলিশ সদস্য, পুলিশের স্থাপনা ও যানবাহন, বিমানবন্দর, দূতাবাস, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মিয়ানমার বা এসব দেশের স্থাপনা ও ব্যক্তি এবং শিয়া ও আহমদিয়া মসজিদ, মাজারকেন্দ্রিক মসজিদ, মন্দির, চার্চ ও প্যাগোডা।

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে আরো বলা হয়, ঘরে তৈরি গ্রেনেড বা বোমা (সময় কিংবা দূরনিয়ন্ত্রিত), ক্ষুদ্রাস্ত্র কিংবা ছুরি-চাপাতি দিয়ে হামলা হতে পারে।

এছাড়া জঙ্গিরা পুলিশের পোশাক পরে পুলিশের স্থাপনায় প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে উল্লেখ করে পোশাক পরা থাকলেও পুলিশ সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত হতে চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে থাকা বিভিন্ন দূতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে বেনারকে জানান বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল মালেক।

সতর্কতার মধ্যেও হামলা

এদিকে সারা দেশের পুলিশকে সতর্ক করে এই চিঠি পাঠানোর পরপরই গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর পল্টন মোড়ে পুলিশের একটি চেকপোস্টের পাশে একটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, এটি হাতে তৈরি বোমা বা আইইডি।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলায় যে বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল তার সাথে এই বোমার মিল রয়েছে।

এদিকে শনিবার রাতেও বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের পাশ থেকে গ্রেনেডসদৃশ আরেকটি বস্তু উদ্ধার করা হয়।

যদিও পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল কালো টেপে মোড়ানো ওই বস্তুতে কোনো বিস্ফোরক পায়নি। শুধু বালু পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে সিটিটিসির উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁরা তদন্ত করে দেখছেন।

তিনি বলেন, “সাধারণত জঙ্গিরা হামলা করে থাকলে দায় স্বীকারের বার্তা দেয়। কিন্তু এই ঘটনায় এখনো তেমন কিছু হয়নি। তবুও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন