Follow us

ছয় শতাধিক চরমপন্থীর আত্মসমর্পণ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-04-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পাবনায় আত্মসমর্পণের সময় চরমপন্থীদের জমা দেওয়া অস্ত্র। ৯ এপ্রিল ২০১৯।
পাবনায় আত্মসমর্পণের সময় চরমপন্থীদের জমা দেওয়া অস্ত্র। ৯ এপ্রিল ২০১৯।
[ফোকাস বাংলা]

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ১৫ জেলার ছয় শতাধিক বাম চরমপন্থী একযোগে আত্মসমর্পণ করেছেন পুলিশের কাছে।

মঙ্গলবার পাবনা জেলা স্টেডিয়ামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ৫৪৫ জন। এছাড়া জেলে অবস্থান করায় এবং ওয়ারেন্ট আদেশ থাকায় তালিকাভুক্ত আরও ৬৯ চরমপন্থী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে হাজির হতে পারেননি বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন পাবনা জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা।

তবে চরমপন্থীদের মধ্যে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির একটি গ্রুপ আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছে, অস্ত্র জমাদানকারীরা ‘বিপথে’ গেছে। তাদের ‘চেহারা উন্মোচন’ করা হবে-এমন ঘোষণা সংবলিত পোস্টারও মেরেছে তারা।

এই দলটি মঙ্গলবার বগুড়ার শেরপুর এলাকায় পুলিশের ওপর গুলি চালিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে আহত করেছে।

এর আগে ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো একযোগে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থীরা।

আত্মসমর্পণকারীদের সমাজে পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য দিয়ে সরকার সহায়তা করবে বলে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে তারা পুনরায় অপরাধ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হচ্ছে কি না তাও তদারকি করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আপনারা আপনাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করুন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন।”

তিনি বলেন, “আমাদের পুলিশ বাহিনী ৩০ বছর আগের পুলিশ বাহিনী নেই। তারা অনেক দক্ষ। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।”

মন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকার আপনাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য যে সুবিধা দিয়েছে সেই সুবিধা গ্রহণ করুন।”

“সরকার আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছে,” জানিয়ে চরমপন্থী নেতা আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আর্ট বাবু অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “সরকার বিভিন্ন সমবায় সমিতি গঠন করে আমাদের সাহায্য করবে। আমরা আমাদের গ্রাম, এলাকাকে উন্নত করার চেষ্টা করব।”

বাবু বলেন, “আস্থার অভাবে অনেক চরমপন্থী আত্মসমর্পণ করতে পারছেন না। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলে তারাও আত্মসমর্পণ করবে।”

অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারি বলেন, আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রম চলবে। আইনি কাঠামোর মধ্যে তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করা হবে।

আত্মসমপর্ণকারীদের মধ্যে পাবনা, নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, রাজশাহী, রংপুর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, রাজবাড়ী, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল ও ফরিদপুর জেলায় সক্রিয় বিভিন্ন চরমপন্থী দলের সদস্যরা রয়েছেন বলে জানায় পাবনা জেলা পুলিশ।

‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে

উত্তরাঞ্চলে বামপন্থী এবং ইসলামী জঙ্গিবাদী কার্যক্রম বিশ্লেষক হাসিবুর রহমান বেনারকে বলেন, “বাম চরমপন্থীরা ১৯৬০ এর দশক থেকেই উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁ, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনায় সক্রিয় ছিল।”

তিনি বলেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তারা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরকার তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ব্যবস্থা নিলেও তাদের কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়নি।

হাসিবুর রহমান বলেন, বামপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মারধর, লুটতরাজসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

২০০২-০৩ সালের দিকে নওগাঁ জেলার আত্রাই, নাটোর, বগুড়ার নন্দিগ্রাম, রাজশাহীর বাগমারা এলাকায় জেএমবি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে অনেক বাম চরমপন্থী ক্যাডার রাতারাতি ইসলামিক জঙ্গি হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, “ছয় শতাধিক চরমপন্থীদের আত্মসমর্পণের পর ওই ১৫ জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে সেটি নিশ্চিত বলা যায়। কারণ, এই সকল চরমপন্থীদের সঠিক সংখ্যা না থাকলেও এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। ”

“এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অন্যান্য চরমপন্থী যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের মনোবল ভেঙে যাবে। যারা আত্নসমর্পণ করেছেন তারা গোপন তথ্য পুলিশকে জানাবেন,” যোগ করেন হাসিবুর।

তবে কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ি এলাকার রফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “দেখুন ১৯৯৯ সালেও কয়েক’শ চরমপন্থী আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল এদের সংখ্যা কমেনি।”

তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো ভোটে জিততে এদের ব্যবহার করে। আর সে কারণেই এদের দমন করা যায় না। চরমপন্থীদের নির্মূল করতে হলে এদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে।”

পুলিশকে গুলি

পাবনায় ৬১৪ চরমপন্থীর আত্মসমর্পণের প্রতিবাদে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির সদস্যরা মঙ্গলবার ভোরে বগুড়া জেলার শেরপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার সেঁটে দেয় বলে বেনারকে জানান বগুড়া জেলার শেরপুর থানার ওসি হুমায়ূন কবির।

তিনি বলেন, ভবানিপুর এলাকায় পোস্টার সেঁটে দেয়ার সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের ওপর গুলি চালায় চরমপন্থীরা।

আক্রমণে নান্নু মিয়া নামের এক পুলিশ উপ-পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন বলে জানান কবির। পুলিশ সদস্যরাও গুলি চালায়। তবে দুর্বৃত্তদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানান ওসি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন