Follow us

শ্রীলঙ্কায় নিহত জায়ান দেশে সমাহিত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শ্রীলঙ্কার একটি বিমানে করে জায়ানের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। ২৪ এপ্রিল ২০১৯।
শ্রীলঙ্কার একটি বিমানে করে জায়ানের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। ২৪ এপ্রিল ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

দেশে আনার পর সমাহিত করা হয়েছে বাবা–মায়ের সাথে ছুটি কাটাতে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানো শিশু জায়ান চৌধুরীকে (৮)। বুধবার বিকেলে তাকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

এর আগে দুপুর পৌনে একটায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় জায়ানের মরদেহ।

নাতি জায়ানের মরদেহ গ্রহণ করে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম। জায়ানকে বাড়িতে নেওয়ার পরে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

জায়ানকে দাফন করা হলেও দেশে ফিরতে পারেননি ওই হামলায় আহত জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি কলম্বোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁকে এখনই দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান শেখ সেলিমের স্বজনেরা।

জানা যায়, তাঁর অবস্থা শঙ্কামুক্ত নয় বলেও জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকেরা। সেখানে কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের পর মশিউল হককে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

গত রোববার ইস্টার সানডের প্রার্থনার মধ্যে দুই দফায় শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা ও চারটি হোটেলসহ আটটি স্থানে একযোগে বোমা হামলা ঘটে। ওই হামলায় নিহত হয় জায়ান এবং আহত হন তার বাবা।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসের ভয়াবহতম ওই হামলায় এ পর্যন্ত ৩৯ জন বিদেশিসহ সাড়ে তিনশ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

বোমায় ক্ষতবিক্ষত জায়ানের দেহ

বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে জায়ানের জানাজায় অংশ নেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। জানাজার পরে জায়ানের মরদেহ দেখতে ভীড় জমান তাঁরা। তবে বোমা হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ায় সবাইকে অনুরোধ করা হয় জায়ানের মরদেহ না দেখার জন্য।

মাঠের চারদিকে বড় বড় এলইডি স্ক্রিনে কেবল জায়ানের মুখ দেখানো হয়। অনেকে মরদেহে ফুল দিতে চাইলেও কবরস্থানে গিয়ে ফুল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

জানাজার আগে সকলের উদ্দেশ্যে কথা বলেন জায়ানের নানা শেখ সেলিম। এ সময় আবেগাপ্লুত সেলিম নাতি, জামাতা ও মেয়ের জন্য সকলের কাছে দোয়া চান।

সন্ত্রাসীদের ধর্ম নেই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের কোনো দেশ ও ধর্ম নেই। জঙ্গি জঙ্গিই, সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই। এদের কোনো ধর্ম নেই। কোনো দেশ-কাল-পাত্র নেই।”

বুধবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গে এ কথা বলেন তিনি।

“সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ কখনো মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এ ধরনের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ থেকে সবাইকে দূরে থাকতে হবে। এ ধরনের ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে কোনো মানুষ যেন জড়িত না হয়। আমরা চাই না এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা আরও ঘটুক,” দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় নিহত জায়ানের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, জায়ান ছোট বাচ্চা। মাত্র ৮ বছর বয়স। সে আজ আমাদের মাঝে নেই। তার বাবাও মৃত্যুশয্যায়। তাকে এখনো জানতে দেওয়া হয়নি জায়ান নেই। জায়ানকে তার বাবা বারবার খুঁজছে। তার মা বা পরিবারের অবস্থা আপনারা বুঝতেই পারেন।”

এর আগে নানা শেখ সেলিমের বাসায় জায়ানের মরদেহ নেওয়ার পরে তাকে শেষবারের মতো দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় শেখ সেলিমসহ আত্মীয়-স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বাংলাদেশে হামলার সুযোগ নেই

শ্রীলঙ্কায় হামলার তিন দিনের মাথায় দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেটস (আইএস)। তবে শ্রীলঙ্কায় আইএসের হামলা হলেও বাংলাদেশে এ ধরনের হামলার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বেনার নিউজকে বলেন, “ইরাক ও সিরিয়া থেকে আইএসকে নির্মূল করা হয়েছে। তাদের যোদ্ধারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। তারা শ্রীলঙ্কায় আক্রমণ চালাতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি আইএস আমাদের জন্য কোনো হুমকি নয়।”

“বাংলাদেশে কোনও আইএস নেই। দেশীয় জঙ্গিরা এখানে সক্রিয় হয়েছে। আমরা তাদের হুমকি মনে করছি না,” বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের মেরুদণ্ড ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি যাতে জঙ্গিরা কোনও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, “শ্রীলঙ্কার বোমা হামলা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের হুমকি শেষ হয়নি।”

“এটি একটি মতাদর্শ, যদিও ভুল। এবং কোনো মতাদর্শ মরে না। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি গির্জা ও হোটেলগুলির ওপর আক্রমণ সম্পর্কে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া থেকে গোয়েন্দা তথ্য আসলেও শ্রীলঙ্কার সরকার কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, বলেন তিনি।

“ইরাক ও সিরিয়ায় জায়গা হারিয়ে আইএস শ্রীলঙ্কায় হামলা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠায় এই মুহূর্তে জঙ্গিরা কোনো আক্রমণ করতে পারবে না,” বলেন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন।

পুলিশ প্রধানকে পদ ছাড়ার নির্দেশ

ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার আগে সতর্ক করলেও তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই জেরে দেশটির পুলিশ প্রধান ও স্বরাষ্ট্রসচিবকে পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রাভন বিজয়বর্ধনে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে আত্মঘাতী হামলায় মোট নয়জন অংশ নিয়েছিল বলে জানান। এদের মধ্যে একজন নারী। হামলাকারীদের আটজনকে শনাক্ত করা গেছে।

দেশটির প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানান, “হামলাকারীদের অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষিত এবং সচ্ছল পরিবার থেকে আসা। এদের একজন প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে অস্ট্রেলিয়া থেকে আইনে পড়ালেখা করে এসেছিল।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন