Follow us

ঢাকায় র‌্যাবের অভিযানে দুই ‘জঙ্গি’ নিহত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা এলাকায় অভিযানের সময় জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ২৯ এপ্রিল ২০১৯।
ঢাকার মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা এলাকায় অভিযানের সময় জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ২৯ এপ্রিল ২০১৯।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

ছয় মাসের বিরতির পর সোমবার রাজধানীতে এক ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকার মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা এলাকায় র‌্যাবের এ অভিযান চলাকালে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুজন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

সোমবার বিকেল ৪টার দিকে অভিযান সমাপ্ত করে এ তথ্য নিশ্চিত করেন র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার (এসপি) মহিউদ্দিন ফারুকী।

তিনি বেনারকে বলেন, “আস্তানা থেকে দু’জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুই জঙ্গির মরদেহ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।”

“আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর আমরা এ আস্তানাটিতে অভিযান শুরু করলে তারা বিস্ফোরণ ঘটায়,” বেনারকে বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান।

“প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তারা আইইডি (ইমপ্রভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আমরা এখনো নিহতদের পরিচয় এবং কোন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য তা নিশ্চিত করতে পারছি না,” তিনি বলেন।

“বিস্ফোরণে দুটি দেহ পুড়ে গেছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ফলে আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় শনাক্তের কোনো সুযোগ নেই। ডিএনএ পরীক্ষা বা অন্য কোনো সূত্র ধরে তাদের পরিচয় বের করতে হবে,” ঘটনাস্থল থেকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করার পর সাংবাদিকদের জানান সিআইডির ক্রাইম সিন শাখার সহকারী পুলিশ সুপার খন্দকার তৌহিদ হাসান।

এর আগে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর নরসিংদীর মাধবদীতে দুই জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে এক নারী ও শিশু আত্মঘাতি হামলায় নিহত হয়। ২০১৬ সালের জুলাইতে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে এ পর্যন্ত শতাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে জানায় র‍্যাব ও পুলিশের সূত্র।

বাংলাদেশে আবারও জঙ্গি হামলার চেষ্টা চলছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন শঙ্কার মধ্যেই র‌্যাবের অভিযানে সোমবার দুই জঙ্গি নিহত হলো। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, অভিযানের মাধ্যমে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দেশে জঙ্গিবাদের গোড়া সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী সিকদার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের গোড়া সম্পূর্ণভাবে অটুট রয়েছে। অর্থাৎ জঙ্গি উৎপাদন ও বিস্তারের অবকাঠামো অটুট রয়েছে।”

“জঙ্গিবাদ দমনে আমরা সফল হয়েছি এটুকু যে, জঙ্গিরা অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে,” বলেন তিনি।

অটুট নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের মূল উৎপাটনে হোলি আর্টিজানের পরে যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি হয়েছিল সেই মাত্রাটা বজায় রাখা এবং ধর্মবাদী রাজনীতি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে জঙ্গিবাদের একটা জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “জঙ্গি হিসেবে যাদের দেখি তারাই সর্বেসর্বা নয়। এর পেছনে বিশ্বের বড় বড় শক্তি রয়েছে। যারা তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জঙ্গিদের ব্যবহার করছে। এর থেকে সহজে বিশ্ববাসী মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কঠিন।”

র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মহিউদ্দিন ফারুকী সাংবাদিকদের জানান, বছিলার ওই আস্তানায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে এমন খবর পাওয়ার পর রোববার রাত ৩টার দিকে টিনশেডের বাসাটি ঘিরে ফেলে র‌্যাব।

অভিযান শুরুর পরপরই বাসাটির ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে সেখানে র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। ভোর পৌনে ৫টার দিকে বড় একটি বিস্ফোরণে ওই বাসাটির চাল উড়ে যায়। ওই বিস্ফোরনেই দুই জঙ্গির মৃত্যু হয় বলে জানায় র‌্যাব।

মহিউদ্দীন ফারুক জানান, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে র‌্যাবের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা সকাল ৯টার দিকে ওই বাড়িতে ঢোকে। ঘটনাস্থল থেকে তিনটা বিদেশি পিস্তল, অবিস্ফোরিত চারটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ির মালিক, তার স্ত্রী, বাড়ির তত্ত্বাবধানকারী এবং বাসাটির পাশের এক মসজিদের ইমামসহ কয়েকজনকে আটক করেছে র‍্যাব।

বাড়ির মালিকের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে থেকে ভ্যানচালক ও চাকরিজীবী পরিচয়ে চার কক্ষের বাসাটির একটি কক্ষ ভাড়া নেয় ওই দুই ব্যক্তি। তবে ভাড়া দেওয়ার সময় তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো কপি নেওয়া হয়নি।

সংসদে নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় হামলার নিন্দা

নিউজিল্যান্ডে এবং শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একটি সর্বাত্মক প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বেনারকে বলেন, “সকল দেশের ও তাদের নাগরিকদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানায় বাংলাদেশের সংসদ।”

এ সময় বিএনপির পাঁচজনসহ সাতজন বিরোধী দলীয় সাংসদ উপস্থিত ছিলেন।

“বাংলাদেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত হতে হবে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে,” সংসদে বলেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুন রশিদ।

শ্রীলঙ্কা ফেরত শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ

গত ২৬ এপ্রিল শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফেরত আসা ১১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তবে ওই ঘটনার সাথে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে সোমবার সাংবাদিকদের জানান সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

তিনি জানান, এই শ্রমিকেরা শ্রীলঙ্কার একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। যার মালিক ইব্রাহিম ইনসাফ আহমেদ; শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় আত্মঘাতী হামলাকারী হিসেবে যার নাম উঠে আসে।

সিটিটিসি প্রধান জানান, ওই হামলায় ইব্রাহিম ইনসাফ মারা যাওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে বিদেশি শ্রমিকদের নিজ নিজ হাইকমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপরেই দেশে আসেন এই ১১ শ্রমিক।

মনিরুল জানান, ইব্রাহিম ইনসাফের সঙ্গে এই শ্রমিকদের যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যতটুকু জানা গেছে, তারা একেবারেই সাধারণ শ্রমিক ছিল। তবে দেশে তাঁদের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি কিছুটা বাড়লেও “এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই” বলে মন্তব্য করেন মনিরুল ইসলাম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন