Follow us

পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি: ৫ জঙ্গি গ্রেপ্তার

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-08-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য। ৯ আগস্ট ২০১৯।
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য। ৯ আগস্ট ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতিকালে পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি মসজিদের পাশের মাঠ থেকে তাঁদের আটক করা হয়। এ সময় দশ​টি ডেটোনেটর ও চারটি গ্যাসের বোতল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

“তারা নব্য জেএমবির (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের) ‘উলফ প্যাকের’ সদস্য,” ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে শুক্রবার সকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম।

মনিরুল জানান, এই জঙ্গিরা দেশে-বিদেশের কিছু সন্ত্রাসী সংগঠনের অনলাইন প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে’ ওই স্থানটিতে একত্রিত হয়েছিল।

জঙ্গিদের ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এই তথ্য জানিয়ে পুলিশের এই উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বলেন, “তারা প্রত্যেকেই এনক্রিপটেড এ্যাপ ‘সিক্রেট চ্যাটের’ মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করত।”

গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন; মোহাম্মদ শিবলী শাহাজাদ ওরফে সাদী, শাহ এম আসাদুল্লাহ মর্তুজা কবীর ওরফে আবাবিল, মাসরিক আহমেদ, মো. আশরাফুল আল আমীন ওরফে তারেক ও এস এম তাসনিম রিফাত।

এর মধ্যে শিবলী ও আবাবিল বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর (ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন) শিক্ষার্থী। মাসরিক যশোর এম এম কলেজ থেকে বিবিএ শেষ করেছেন। এ ছাড়া তারেক ও রিফাত এসএসসি পাস করেছেন।

শিবলীর বাড়ি কুমিল্লায়, আবাবিলের বরিশালে, মাসরিকের যশোরে, তারেকের টাঙ্গাইলে এবং রিফাতের খুলনায়। তাঁদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক বেনারকে বলেন, “থানায় মালা হয়েছে, তবে মামলাটি কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগই তদন্ত করবে। তারাই আসামিদের আদালতে হাজির করে ‘রিমান্ডে’ নেওয়ার আবেদন জানাবে।”

“আজই (শুক্রবার) তাঁদের আদালতে নেওয়া হতে পারে,” জানান ওসি।

উলফ প্যাক’ কী?

“২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর পুলিশি অভিযানে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দেওয়া হলেও জঙ্গিরা ছোট ছোট দলে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছে,” বলে জানান সিটিটিসি প্রধান।

সম্প্রতি জঙ্গিদের টেলিগ্রামভিত্তিক প্রোপাগান্ডা চ্যানেল ‘বালাকোট মিডিয়া’ প্রকাশিত ‘লোন উলফ’ নামের একটি বাংলা ম্যাগাজিনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, নিজে থেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ আক্রমণকারীদের ‘লোন উলফ’ (নিঃসঙ্গ ঘাতক) বলা হয়। তারা ভাবগত দিক থেকে বৈশ্বিক জিহাদি আন্দোলনকে সমর্থন করে স্বপ্রণোদিত হয়ে হামলা চালায়। আর এমন কয়েকজন জঙ্গি মিলে ‘স্লিপার সেল’ গঠন করলে সেটাকে ‘উলফ প্যাক’ বলা হয়।

গত বছরের ৩ মার্চ সিলেটে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যা চেষ্টার ঘটনাটি ‘লোন উলফ’ হামলার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। এর আগের দিন দুপুরে আশকোনায় র‍্যাবের নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে দেয়াল টপকে প্রবেশ করে আত্মঘাতি হামলা চালায় এক যুবক।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ২৫০ জঙ্গির ওপর পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত জরিপে বলা হয়েছে, তাদের ৮২ শতাংশই ‘ইন্টারনেট কন্টেন্ট’ (লেখা, ছবি বা অডিও-ভিডিও) দেখে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গত ২১ জুন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক এক কর্মশালায় পুলিশ এই তথ্য প্রকাশ করে।

সতর্ক আছে পুলিশ

গত পহেলা মে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অনুবাদ বিভাগ আল-মুরসালাত মিডিয়ায় বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় একটি বার্তা প্রকাশ করে।

আবু মুহাম্মদ আল বাঙ্গালী, যাকে আইএস ‘বাংলার খালিফা’ ঘোষণা করেছে, তার নামে দেওয়া ওই বার্তায় বাংলাদেশ ও ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

এর আগেই ২৯ এপ্রিল ঢাকার গুলিস্তানে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা (আইইডি) নিক্ষেপ করা হয়। এরপর ২৬ মে রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে সময় নিয়ন্ত্রিত বোমা বিস্ফোরিত হয়। এ ছাড়া গত ২৩ জুলাই রাতে রাজধানীর পল্টন ও খামারবাড়ি এলাকায় দুইটি পুলিশ বক্সের কাছে দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের পর নিষ্ক্রিয় করা হয়।

এই তিনটি ঘটনারই দায় স্বীকার করেছে আইএস। তবে সরকার বা পুলিশ বলেছে, এরা দেশে বেড়ে ওঠা জঙ্গি।

সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় গত এপ্রিলেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে ব্যক্তিগত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে “ঈদুল ফিতরের জামাতে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা ছিল” উল্লেখ করে গত ৯ জুন সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক চেষ্টায় কোনো অঘটন ছাড়াই সব কিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনাকালে বিস্ফোরকসহ ‘উলফ প্যাকের’ পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার হওয়া প্রসঙ্গে নিউ মিডিয়া এবং জঙ্গিবাদ বিষয়ক গবেষক নির্ঝর মজুমদার বেনারকে বলেন, “এটি এমন একটি ইঙ্গিত, যা এখানে উগ্র মতাদর্শবাদী গোষ্ঠীগুলোর গভীর সক্রিয়তাই প্রমাণ করে।”

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক বোমা হামলায় আইএসের দায় স্বীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সম্ভবত প্রতিটি ঘটনাই পরস্পর সংযুক্ত।” তা ছাড়া গত এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় হামলার পরে ‘এই ধরনের উদঘাটন বেশ গুরুতর’ বলেও মনে করেন নির্ঝর।

তাঁর দাবি, “গত এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার আক্রমণকারীদের ব্যাপারে প্রকাশিত উপাত্ত এবং এই গ্রেপ্তারকৃতদের সম্পর্কে পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে তারা আদর্শিকভাবে এক। যে কারণে এটা ভাবা যুক্তিসঙ্গত যে, এই মতাদর্শের জঙ্গিরা বাংলাদেশেও একই ধরনের হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে।”

একমাসে গ্রেপ্তার ২২ জঙ্গি

সর্বশেষ এই পাঁচ জঙ্গিসহ গত এক মাসে কমপক্ষে ২২ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে।

৩ আগস্ট যশোরের মনিরামপুরে আনসার আল ইসলামের স্বক্রিয় সদস্য সন্দেহে শাকিল হোসেন সাগর নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ৩১ জুলাই রাজধানীর সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে একই সংগঠনের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে তারা।

ওই সংগঠনের সাথে সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ২৬ জুলাই রাতে রূপনগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় একই পরিবারের চার সদস্যকে। তখন তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।

২৫ জুলাই মিরপুর ও দোহার থেকে জেএমবির সক্রিয় দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ২২ জুলাই যাত্রাবাড়ির শেখদি এলাকা থেকে হিযবুত তাহরীরের শীর্ষ নেতা তানভীর হাসান নাঈমকে (৩১) গ্রেপ্তার করে পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিট।

২০ জুলাই যশোরের মনিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজার থেকে আনসার আল ইসলামের দুই সদস্যকে আটক করা হয়। ১২ জুলাই চট্টগ্রামের বন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নব্য জেএমবির তিন সক্রিয় সদস্যকে। এছাড়া ৮ জুলাই বরিশাল শহরের একটি মাদ্রাসা থেকে আনসার আল ইসলামের দুই নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিদায়ী ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া ওই পদে নিজের শেষ কর্মদিবসে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “হোলি আর্টিজান হামলার পর আমরা ছোট বড় ৬০টি জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালিয়েছি। তাতে অনেক জঙ্গি নিহত হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তার করেছি।”

“ছয় মাসের মধ্যে আমরা জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক বিধ্বস্ত করেছি,” যোগ করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন