Follow us

‘নতুন কৌশলে’ পুলিশের ওপর জঙ্গি হামলা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-09-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পুলিশ বক্সের কাছে বোমা হামলার স্থানটি ঘিরে রাখে পুলিশ। ৩১ আগস্ট ২০১৯।
ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পুলিশ বক্সের কাছে বোমা হামলার স্থানটি ঘিরে রাখে পুলিশ। ৩১ আগস্ট ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

হলি আর্টিজান হামলার পর প্রায় তিন বছর নিশ্চুপ থেকে ‘ভিন্ন ও নতুন কৌশলে’ আবার হামলা শুরু করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। তাদের আক্রমণের নতুন লক্ষ্য কর্তব্যরত পুলিশ।

এ বছর ২৯ এপ্রিল থেকে গত শনিবার পর্যন্ত মোট তিনটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। আর বিস্ফোরণ ঘটার আগে দুটি পুলিশ বক্সের কাছে পেতে রাখা আইডি (ইমপ্রুভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধার করেছে পুলিশ।

আর এগুলোর দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে এককালের সিরিয়া-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট। তবে সরকার বরাবরের মতো দেশে আইএস’র উপস্থিতি অস্বীকার করেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০১৬ সালের পয়লা জুলাই ঘটে যাওয়া হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশি ব্যাপক তৎপরতার কারণে সংঘবদ্ধভাবে হামলা পরিচালনার ক্ষমতা হারিয়েছে জঙ্গিরা।

তাই, নতুন কৌশল অনুযায়ী, পুলিশ ভ্যান অথবা পুলিশ বক্সের কাছে গোপনে বোমা পেতে রেখে রিমোট কন্ট্রোল অথবা টাইমার দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে তারা। তাঁদের মতে এ ধরনের হামলা ঠেকানো খুবই কঠিন। এটি জঙ্গি দমনে পুলিশের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমডোর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে জঙ্গিদের সংখ্যা কম। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে হলি আটিজানের মতো হামলা করার অবস্থায় নেই। এ কারণে তারা তাদের কৌশল বদল করেছে। এখন তারা বোমা পেতে রেখে রিমোট কন্ট্রোল অথবা টাইমারের মাধ্যমে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “পুলিশের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা আগে যে হয়নি তা নয়। তবে আমরা পুলিশের ওপর সাম্প্রতিক যে বোমা হামলা দেখছি সেগুলো জঙ্গিদের একটি নতুন অ্যাপ্রোচ বা নতুন কৌশল বলা যায়।”

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, “এ ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে জঙ্গিরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। যারা আক্রমণগুলো করছে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে বোমা পেতে পুলিশের ওপর হামলা মোকাবিলা করা কঠিন। এটি জঙ্গি দমনের নতুন চ্যালেঞ্জ।”

তিনি বলেন, “বোমা পেতে রেখে হামলা ঠেকাতে পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বেলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গি দমন করা হয়েছে মূলত পুলিশি অপারেশনের মাধ্যমে। হলি আর্টিজান হামলার পর আইএস আদর্শিক জঙ্গি সংগঠন নব্য-জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপারেশনের মাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিয়েছে। এরপর তারা চুপচাপ থেকেছে প্রায় তিন বছর।”

তিনি বলেন, “এবার তারা গোপনে পুলিশের অবস্থানে আইডি রেখে সেটি দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে।”

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, “এ ধরনের আক্রমণকে সামরিক ভাষায় হয়নারিমূলক যুদ্ধ বলা যায়। এগুলো ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। জঙ্গিরা কোনো জায়গায় আইডি গোপনে রেখে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটালে সেটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।”

পুলিশের মনোবল ভাঙতে এই হামলা

পুলিশের ওপর হামলা শুরু হয় ২৯ এপ্রিল ওই রাতে গুলিস্তান কমপ্লেক্স এর পূর্ব দিকে কর্তব্যরত পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালানো হয় দূর-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের মাধ্যেম। ওই ঘটনায় আহত হন কর্তব্যরত তিন পুলিশ সদস্য।

২৬ মে মালিবাগ মোড়ে পুলিশের গাড়িতে বোমা পেতে রাখা হয়। পরে দূর-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই ঘটনায় এক নারী পুলিশ সদস্যসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।

২৩ জুলাই ঢাকার খামারবাড়ি পুলিশ বক্স এবং পল্টন পুলিশ বক্সের পাশ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করা হয়। বোমা দুটি বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে পুলিশ।

সর্বশেষ গত শনিবার রাতে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পুলিশ বক্সের কাছে বোমা হামলা হয়। সেই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। বোমা হামলায় মন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন।

কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “পুলিশের ওপর পরিচালিত তিন হামলা এবং দুটি বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো তদন্ত করছে কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। ওই সকল তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। কাজ চলছে।”

তিনি বলেন, “আমরা এখনো নিশ্চিত নই কারা এই হামলা চালিয়েছে। তবে আমাদের সন্দেহ, কোনো জঙ্গি সংগঠন হামলা চালিয়েছে।”

সাইফুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের ওপর পরিচালিত হামলায় ব্যবহৃত বোমাগুলো ছিল আইইডি (ইম্প্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)। তবে বোমায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকগুলো ছিল নিম্নমানের। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেশি হয়নি।”

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র মাসুদুর রহমান বেনারকে জানান, এখন পর্যন্ত এই ঘটনাগুলোর দায়ে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

তিনি বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার কারণে আমরা আমাদের সকল সদস্যকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছি। আবার ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে চেকপয়েন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে।”

পুলিশের ওপর হামলার পর পুলিশ সদর দপ্তরে সোমবার বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজমসহ অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

মাসুদুর রহমান বলেন, “পুলিশের ওপর শনিবারের আক্রমণের ওই সকল হামলার তদন্ত সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আট সদস্যের তদন্ত সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম।”

কর্তব্যরত পুলিশের ওপর হামলার কারণ কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “জঙ্গি প্রতিরোধে এবং জঙ্গি দমন করতে মূল কাজ করেছে পুলিশ। এ কারণে জঙ্গিরা পুলিশের ওপর ক্ষিপ্ত। তারা মনে করে, পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে পারলে তাদের কার্যক্রম চালাতে সুবিধা হবে। এ কারণেই পুলিশের ওপর হামলা।”

এদিকে পুলিশের ওপর হামলার রহস্য দ্রুতই উদ্ঘাটিত হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। বৃহস্পতিবার মিরপুর স্টাফ কলেজে ইন্টারপোলের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

“ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে,” মন্তব্য করে আইজিপি বলেন, “খুব সহসাই আসামি শনাক্ত হবে বলে আশা করা যায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন