Follow us

নারায়ণগঞ্জে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গ্রেপ্তার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-09-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের নেতৃত্বে বোমা নিস্ক্রিয়কারী ইউনিট, সোয়াট, জেলা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস অংশ নেয়। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের নেতৃত্বে বোমা নিস্ক্রিয়কারী ইউনিট, সোয়াট, জেলা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস অংশ নেয়। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং তাঁর ব্যাংক কর্মকর্তা স্ত্রীকে সোমবার আটক করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)।

আটককৃতরা নব্য জেএমবির সদস্য বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। সম্প্রতি ঢাকায় পুলিশের ওপর বিভিন্ন হামলার সাথে তাঁরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি বোমা হামলার ঘটে। আর বিস্ফোরণ ঘটার আগে দুটি পুলিশ বক্সের কাছে পেতে রাখা আইডি (ইমপ্রুভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধার করে পুলিশ। এককালের সিরিয়া-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এগুলোর দায় স্বীকার করে। তবে সরকার বরাবরই দেশে আইএস এর উপস্থিতি অস্বীকার করে এসেছে।

অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। সেসব বিস্ফোরকের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় পাওয়া বিভিন্ন বোমার মিল রয়েছে বলে জানানো হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির অস্তিত্বের কারণেই জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাচ্ছে না। তবে দেশে সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলার ঘটনার সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা নেই বলে মনে করেন তাঁরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব) এ কে মোহাম্মদ আলী সিকদার বেনারকে বলেন, "দেশে জঙ্গি আছে। নতুন নতুন জঙ্গির উৎপত্তিও হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের ভেতরে এর শিকড় অটুট রয়েছে। এই শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত চলতে থাকবে।”

তাঁর মতে, "বাংলাদেশের রাজনীতির ভেতরে জঙ্গিবাদ গ্রথিত। দেশে যত দিন ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ না করা হবে, পরিপূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় সেখানে ফেরত না যাওয়া হবে, তত দিন জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হবে না।”

দেশীয় জঙ্গিদের সাথে আইএসের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, "দেশীয় জঙ্গিরাই নিজেদের শক্তি এবং সামর্থ্য বোঝাতে আইএসের নাম ব্যবহার করছে বলে আমি মনে করি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হামলার যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তার সাথে আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটির মিল নেই।”

ফতুল্লা অভিযান

পুলিশ জানায়, ফতুল্লার যে বাড়িতে অভিযান চালানো হয় সেটির মালিক জয়নাল আবেদীন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা। তাঁর বড় ছেলে ফরিদউদ্দিন রুমি (২৭) ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর ছোট ছেলে জামালউদ্দিন রফিক (২৩) খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী। রুমির স্ত্রী জান্নাতুল ফোয়ারা একটি ব্যাংকে চাকরি করেন।

অভিযান শেষে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “রোববার রাতে ঢাকা থেকে মিজান নামে এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফরিদউদ্দিন রুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ”

তিনি জানান, একই বাড়ি থেকে রুমির স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। যদিও তাঁর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত নয়। এছাড়া রুমির ছোট ভাই পলাতক রয়েছেন।

বাড়িটি ছিল বিস্ফোরকের কারখানা

সিটিটিসির সহকারী কমিশনার মো. তৌহিদুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “ওই বাড়িটির ভেতরটা ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসসহ (আইইডি) বিভিন্ন বিস্ফোরক দিয়ে ল্যাবরেটরির মতো সাজানো ছিল। মূলতঃ এই বাড়িটিকে তারা কারখানা হিসেবে ব্যবহার করেছে। ”

সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম জানান, “সম্প্রতি ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলায় বোমার যেসব উপাদান ছিল সেসব উপাদান, টয়গান ও ভেস্ট ফতুল্লার এই বাড়িটিতে পাওয়া গেছে।”

তিনি বলেন, “কয়েক মাস আগে আইএসের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। যেখানে কয়েকজন তরুণের হাতে টয়গান দেখা যায়। ওই টয়গানের সঙ্গে ফতুল্লার বাড়িতে পাওয়া টয়গানের অনেকটা মিল রয়েছে।”

পুলিশ জানায়, অভিযানে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল চারটা বোমা নিষ্ক্রিয় করেছে। প্রত্যেকটি বোমা ছিল শক্তিশালী। ফ্রিজে রাখা একটি বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দ শোনা

সিটিটিসির নেতৃত্বে অভিযানে অংশ নেয় বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট, সোয়াট, জেলা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।

প্রতিবেশিরা যা বলছেন

ফতুল্লার তক্কার মাঠে জয়নাল আবেদীনের প্রতিবেশি মো. আক্কাস আলী। জয়নাল আবেদিনের ছেলে দুটি বড় হয়েছে তাঁর চোখের সামনে। পুলিশ জঙ্গি সন্দেহে তাদের বাড়ি ঘিরে রেখেছে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

“আমি অবাক হয়ে গেছি। ছেলে দুইটা খুবই ভালো ছিল লেখাপড়ায়। ভদ্র। মাঝে মাঝে দেখা হতো। ওদের বাবাও খুব ভালো মানুষ। ধর্মকর্ম করত। বাড়াবাড়ি দেখি নাই,” বেনারকে বলেন আক্কাস আলী।

মো. হাসান নামের আরেক বাসিন্দা বেনারকে বলেন, “যে বাড়িতে অভিযান চলছে, সে বাড়িতে জয়নাল আবেদিনের পরিবার থাকে না। তাঁরা থাকেন পাশেই একটি দ্বিতল ভবনে।”

“যেখানে অভিযান হলো সেটাও জয়নাল আবেদিনের বাড়ি। তবে ওখানকার বাড়িটি টিনের। মাসছয়েক আগে জয়নাল আবেদিনের পরিবারের লোকজন ভাড়াটে তুলে দেন। তখন থেকে জায়গাটা ফাঁকা পড়েছিল,” হাসান বলেন।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রাপ্তি রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন