Follow us

অভিযানের দ্বিতীয় দিনে নরসিংদীতে দুই নারী জঙ্গির আত্মসমর্পণ

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-10-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আত্মসমর্পণের পর নরসিংদীর মাধবদী এলাকার নিলুফা ভবনে অবস্থানকারী দুই নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৭ অক্টোবর ২০১৮।
আত্মসমর্পণের পর নরসিংদীর মাধবদী এলাকার নিলুফা ভবনে অবস্থানকারী দুই নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৭ অক্টোবর ২০১৮।
নিউজরুম ফটো

নরসিংদীর মাধবদী এলাকার নিলুফা ভবনে অবস্থানকারী দুই নারী জঙ্গি বুধবার আত্মসমর্পণ করেছে। এর মধ্যে দিয়ে সোমবার রাত নয়টা থেকে শুরু হওয়া অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। এই অভিযানের শুরুতেই দুই জঙ্গি নিহত হয়েছিল।

অপর দুজনকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সময় লেগেছে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের (সিসিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম বিকেলে নিহত ও গ্রেপ্তার চার জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ করেন। নিহতদের একজন আবু আবদুল্লাহ আল বাঙালি, অপরজন আকলিমা আক্তার মনি।

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ নারী–পুরুষ ও শিশু জঙ্গি দমন অভিযানে নিহত হলেন।

বুধবার আত্মসমর্পণকারী দুই নারীর নাম খাদিজা আখতার মেঘনা ও ইশরাত জাহান মৌ।

“নিহত আবু আবদুল্লাহ আল বাঙালি হলেন নব্য জেমএবির মিডিয়া শাখার প্রধান। আকলিমা, খাদিজা ও ইশরাত তিনজনই রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানারাতের শিক্ষার্থী ছিলেন।”

“২০১৬ সালের আগস্টে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন,” সাংবাদিকদের বলেন মনিরুল।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বেনারকে বলেন, “জঙ্গি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করা সময়সাপেক্ষ বলেই তারা জামিনে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এটা একটা বড় সমস্যা।”

“জেলের মধ্যে জঙ্গিবাদের বিস্তার থামানোর জন্যও সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকা উচিত,” উল্লেখ করেন তিনি।

সম্প্রতি র‌্যাব-৪ ডেমরা থেকে শাহনাজ আক্তার সাদিকা নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা তদন্ত করতে গিয়ে র‌্যাব ওই নারীদের পুনরায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার খবর জানতে পারে। তখন থেকেই তাদের খোঁজা হচ্ছিল।

এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে চায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আত্মসমর্পণকারী দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ক তথ্য প্রকাশ করা হবে।

আটকদের জেলা আদালতে হাজির করা হবে বলে বেনারকে জানান নরসিংদীর পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন।

অভিযানের দ্বিতীয় পর্ব

শেখের চরের কাছেই মাধবদীর নিলুফা ভবনটি সোমবার রাত থেকেই ঘিরে রেখেছিল সোয়াট, সিসিটিসি, ল ফুল ইন্টারসেপশন ইউনিট (এলআইসি), জেলা পুলিশ ও র‌্যাব। মঙ্গলবার বিকেলে অভিযানের প্রথম পর্ব শেষ হয়। পরে বুধবার সকালে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করে তারা।

অভিযানে অংশগ্রহণকারী এক কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, “সিসিটিসি’র যে সদস্যদের জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা করার অভিজ্ঞতা আছে, সকাল থেকেই তাঁরা কাজে নেমে পড়েন।”

সাততলা ভবনটিতে অবস্থানরত দুই জঙ্গিকে বলা হয়, যেহেতু তারা কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে যুক্ত হয়নি বা হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি, সেহেতু তাদের সর্বোচ্চ আইনগত সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। তারা যেন বেরিয়ে আসে।

এর আগে ড্রোনের মাধ্যমে ভবনের ভেতর জঙ্গিদের অবস্থান ও যাতায়াতের বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা। বেলা দেড়টার দিকে দুই নারী সাদা কাপড় নাড়তে শুরু করেন। পরে সেখান থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযানে অংশ নেওয়া ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ভবনের ভেতর থেকে তারা বেশ কিছু চিরকুট উদ্ধার করেছেন, যেখানে সংগঠনের বাইরের সবাইকে ‘কাফির’ বলে উল্লেখ করে স্রষ্টার কাছে তাদের ধ্বংস কামনা করেছে জঙ্গিরা।

পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ

মনিরুল বলেন, “এই নারীদের সঙ্গে কিছু বিস্ফোরক ছিল। আত্মসমর্পণের আগে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট কাজ শুরু করেছে।”

“সেখানে কী ধরনের বিস্ফোরক ছিল তা যাচাই–বাছাইয়ের পর জানা যাবে,” বলেন তিনি।

শেখেরচরে মঙ্গলবার যে ভবনে অভিযান হয়, সেই ভবনের বেশ কিছু ছবি পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেখানে দেওয়ালে আল্লাহু, দাওলাতুল ইসলাম ও আইএস লেখা রয়েছে।

জামিনে বেরিয়ে ফের জঙ্গিবাদে

২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট র‌্যাব–৪ পাইকপাড়ায় তাদের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা চার নারীর জঙ্গিবাদে জড়ানো এবং তাদের আটকের তথ্য প্রকাশ করে।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, ওই দলের প্রধান মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি (সম্মান) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী আকলিমা রহমান মনি। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইশরাত জাহান মৌসুমি ওরফে মৌ ও খাদিজা পারভিন মেঘলাকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেন।

এ ছাড়া তাদের সাথে ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ইসতিসনা আক্তার।

জিজ্ঞাসাবাদে ওই সময় আকলিমা র‌্যাবকে জানান, তিনি গাজীপুরের হাজিরপুকুর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যেতেন। সেই মসজিদের নিচতলার একটি গ্রন্থাগার থেকে জসীমউদ্দীন রাহমানীর লেখা দুটি বই কিনেছিলেন।

ওই গ্রন্থাগারের মালিক আনসার আলী তাঁকে মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মাহমুদুল হাসান তাকে ‘আইএস’ সম্পর্কে জানান।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বেনারকে বলেন, “ধারণা করছি নরসিংদীর অভিযানে নিহত আবু আবদুল্লাহ আল বাঙালিই মাহমুদুল হাসান।”

আকলিমা তার সহযোগীদের নিয়ে গুলশানে এক আরবি শিক্ষকের বাসায় যেতেন। ধানমন্ডিতেও এক শিল্পপতির বাসায় তাঁদের যাতায়াত ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রভাষকের নামও বলেছিলেন।

ওই সময় মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেছিল র‌্যাব। মামলার এজাহারে দশ নারীর নাম উল্লেখ ছিল।

গত ১২ জুন কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন নব্য জেএমবির নারী শাখার প্রধান হুমায়রা ওরফে নাবিলা। প্রায় একই সময়ে আরও অন্তত পাঁচজন জঙ্গি জামিনে বের হয়ে গেছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। যেখানে বলা হয়, “গত বছরের ২ জুন থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে প্রায় ৩০০ জন জঙ্গি সদস্য জামিনে মুক্তি পেয়েছে।”

এটি ‘বেশ বড় সংকট’ বলে মনে করছেন র‌্যাব মুফতি মাহমুদ।

খাদিজার বাড়ি শেরপুরে

আত্মসমর্পনকারী খাদিজা আখতার মেঘনার গ্রামের বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার হাতিবান্ধা ইউনিয়নের বেলতৈল গ্রামে। তাঁর বাবা খোরশেদ আলমের মুঠোফোনটি বন্ধ রয়েছে।

হাতিবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বেনারকে বলেন, “খাদিজাকে বহুদিন ধরে এলাকায় দেখা যায়নি। পরিবারের লোকজন মাঝখানে এসে আমার কাছ থেকে তার একটা চারিত্রিক সনদপত্র নিয়ে গিয়েছিল।

“মেয়ে চাকরি পেয়েছে বলে জানিয়েছিল তারা,” বলেন তিনি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শরীফ খিয়াম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন