Follow us

আইএস নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারীরা আদৌ বাংলাদেশি কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-04
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ায় একটি সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ১২ জানুয়ারি ২০১৮।
ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ায় একটি সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ঘিরে র‍্যাবের পাহারা। ১২ জানুয়ারি ২০১৮।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কট্টরপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী কথিত বাংলাদেশিরা আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

শনিবার আইএস’র বিবৃতি প্রচারকারী নাশেরনিউজ মিডিয়া তাদের নতুন নেতা আবু ইব্রাহিম আল-হাশমি আল-কুরেশির প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী কিছু কথিত বাংলাদেশি ও মিশরীয় নাগরিকের ছবি প্রকাশ করেছে। তাদের মুখ কাপড়ে ঢাকা। পিছনে আইএস’র কালো পতাকা।

ছবিতে কয়েকজন তরুণকে আইএস’র কালো পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে আল-কুরেশির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যায়।

সম্প্রতি আইএস এর সর্বোচ্চ নেতা আবু বকর আল বাগদাদী হত্যার পর সংগঠনটির নতুন নেতা নির্বাচিত হন আল-কুরেশি।

তবে কাউন্টার টেররিজম অ্যাণ্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমস ইউনিটের কর্মকর্তারা বেনারকে জানান, আইএস’র নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ‘তথাকথিত’ বাংলাদেশিদের ছবিটি তাঁরা দেখলেও নিশ্চিত নন ছবির ব্যক্তিরা আদৌ বাংলাদেশি কি না।

তাঁরা ছবিটি পরীক্ষা করে দেখছেন বলে বেনারকে জানান কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমস ইউনিটের ডেপুটি কমিশনার সাইফুল ইসলাম।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে থেকে যারা ইরাক-সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের পক্ষে যুদ্ধ করতে গেছে এবং এখনো যারা জীবিত আছে তারা হয়তো নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।

ডেপুটি কমিশনার সাইফুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বাংলাদেশি বলে যাদের দেখানো হয়েছে সেই ছবি আমরা দেখেছি। আমরা পরীক্ষা করে দেখছি, ছবিতে যাদের বাংলাদেশি বলে প্রচার করা হয়েছে তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না।”

তিনি বলেন, “ছবিতে যাদের দেখানো হয়েছে তাদের মুখ ঢাকা। তাই তাদের বের করা খুব কঠিন। তাছাড়া, ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছে সেটিও জানা খুব কষ্টকর।”

সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের আলাদা সাইবার অপরাধ ইউনিট আছে। আমরা তাদের মাধ্যমে অনলাইনে জঙ্গিদের তৎপরতা মনিটর করি।”

তবে তিনি জানান, তিনি প্রথমবারের মতো নাশেরনিউজের নাম শুনেছেন। নাশেরনিউজ বাংলাদেশ থেকে দেখা যায় না।

সাইফুল বলেন, “যেসকল জঙ্গি নিখোঁজ রয়েছে তাদের একটি তালিকা আমাদের কাছে আছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রতিবেদন দেখা যায় ওই সকল নিখোঁজ বাংলাদেশিরা ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস’র পক্ষে যুদ্ধ করতে গেছে। আমাদের অবস্থান হলো বাংলাদেশে আইএস’র উপস্থিতি নেই।”

তিনি বলেন, “আমরা জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছি, যদিও তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি।”

সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেবো না। আমাদের বিমানবন্দরগুলোকে তাদের ব্যাপারে তথ্য জানান হয়েছে। দেশে প্রবেশ করলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।”

বাংলাদেশে আইএস আছে এটি আন্তর্জাতিক প্রচারণা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, বাংলাদেশ বাগদাদীর মৃত্যু নিয়ে কোনো প্রকার শঙ্কিত নয়।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আইএস’র কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় জঙ্গিরা নিজেদের ফলাও করার জন্য আইএস’র নাম ব্যবহার করে। বাংলাদেশে আইএস আছে এটি আন্তর্জাতিক প্রচারণা।”

“জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান সবসময়ই চলছে। বাগদাদীর মৃত্যুতে আমরা কোনো প্রকার বিচলিত নই”, যোগ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, “আমাদের পুলিশ বাহিনী, র‍্যাব কাজ করছে। গোয়েন্দারা কাজ করছে। আমরা জঙ্গিদের উঠে দাঁড়াতে দেবো না।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) একেএম মোহাম্মদ আলী শিকদার বেনারকে বলেন, বাংলাদেশে আইএস’র উপস্থিতি আছে কি না এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশেষ করে সাইট ইন্টিলিজেন্স থেকে আমরা জানতে পারি যে বাংলাদেশে বিভিন্ন আক্রমণের দায় স্বীকার করেছে। আবার সরকার তা অস্বীকার করেছে।”

তিনি বলেন, “আইএস জঙ্গিরা অনেক বড় নৃশংস হামলা চালায়, হত্যাকাণ্ড চালায়। তারা যখন বাংলাদেশে একটি ককটেল ফাটানোর দায়-দ্বায়িত্ব স্বীকার করে তখন সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।”

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী বলেন, “সত্য কথা বলতে কি, আইএস’র নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা যাদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে তারা বাংলাদেশি কি না সেটি নির্ধারণ করা খুব কঠিন। তাছাড়া ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছে সেটিও বের করা খুব কঠিন।”

“তবে ছবিতে মুখ ঢাকা যাদের দেখা যাচ্ছে তারা বাংলাদেশি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তারা বাংলাদেশি হতেও পারে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তার কারণ হলো আমার নিজের হিসাবে কমবেশি একশ’র মত বাংলাদেশি নাগরিক আইএস’র পক্ষে যুদ্ধ করতে ইরাক ও সিরিয়া পালিয়ে গেছে।”

তার মতে, অনেক বাংলাদেশি যারা ইরাক-সিরিয়ায় গেছে তারা বিভিন্ন সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছে। আইএস’র খেলাফত ধ্বংস হওয়ার পর যারা বেঁচে আছে তারা ইরাক-সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় লুকিয়ে আছে।

তিনি বলেন, “যারা বেঁচে আছে তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। পৃথিবীর কোনো দেশ তাদের নিচ্ছে না। বাংলাদেশও তাদের ফিরতে দেবে না। সুতরাং, তারা কী করবে? আইএস’র নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ছাড়া তাদের বিকল্প কিছু নেই।”

তাঁর মতে, “বাংলাদেশের জঙ্গিদের শেকড় এক জায়গায়। জঙ্গিরা একেক সময় একেক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করে। আবার তারা একেক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের আদর্শকে ধারণ করে। যেমন কিছু জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ আল-কায়েদার আদর্শে বিশ্বাসী। আইএস’র বিস্তার ঘটলে তাদের একাংশ আইএস আদর্শ ধারণ করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে।”

মোহাম্মদ আলী বলেন, “বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো হলি আর্টিজানের মতো সংঘবদ্ধ হামলা পরিচালনার ক্ষমতা রাখে না। তবে তারা ছোটখাট সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না তা নয়।”

তিনি বলেন, “পুলিশি তৎপরতার কারণে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সুতরাং, আপাতত আমরা বাগদাদী হত্যার প্রতিশোধে ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়তো দেখব না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন