Follow us

নিষিদ্ধ হলো জঙ্গি সংগঠন আল্লাহর দল

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার হাতিরঝিল থেকে আল্লাহর দলের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ১৯ আগস্ট ২০১৯।
ঢাকার হাতিরঝিল থেকে আল্লাহর দলের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ১৯ আগস্ট ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

অবশেষে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলো জঙ্গি সংগঠন ‘আল্লাহর দল’। এ নিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও উগ্র ইসলামি সংগঠন হিসেবে আটটি দলকে নিষিদ্ধ করা হলো।

অন্য সাতটি সংগঠনের মধ্যে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি–বি) ও শাহাদাৎ-ই আল-হিকমা নিষিদ্ধ হয় ২০০৫ সালে।

২০০৯ সালে নিষিদ্ধ করা হয় হিযবুত তাহ্‌রীরকে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে ২০১৫ সালে নিষিদ্ধ করার পর সংগঠনটি আনসার আল ইসলাম নামে তৎপরতা শুরু​ করে। ২০১৭ সালের মার্চে আনসার আল ইসলামকেও নিষিদ্ধ করে সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বুধবার বেনারকে বলেন, “দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছিল—এমন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”

তিনি বলেন “আশির দশকে উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধা থেকে শুরু ক্ষুদ্র এই জঙ্গি সংগঠন এখন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে বিস্তৃত হয়ে দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

“দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বিস্তার ঘটেছে। তারা বিভিন্ন স্থানে উগ্রবাদী লিফলেট বিলি করে। তারা দেশে নাশকতা করার চেষ্টা চালাচ্ছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “২০০৪ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার সময় আল্লাহর দলকে বোমাবাজির জন্য ভাড়া করে জেএমবি। তারা কিছু কিছু স্থানে বোমা হামলা চালায়।”

তিনি বলেন, “আল্লাহর দলের প্রতিষ্ঠাতা গাইবান্ধার মতিন মেহেদী নামের এক জঙ্গি নেতা।”

মতিন মেহেদী সন্ত্রাসী মামলায় দণ্ডিত হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন বলে জানান মনিরুল।

নাশকতার পরিকল্পনা

এ বছর আগস্ট মাসে ঢাকার হাতিরঝিল এলাকা থেকে আল্লাহর দলের ভারপ্রাপ্ত আমির ইব্রাহিম আহমেদ হিরোসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

‌র‌্যাব জানায়, আল্লাহর দলে ওই চার সদস্য নিজেদের প্রধান নেতা মতিন মেহেদী ওরফে মতিন মাহবুবকে জেল থেকে মুক্ত করতে ‘প্রিজন ভ্যানে’ হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল।

২০১৫ সালে জেএমবিসহ আরও চার জঙ্গি সংগঠনকে নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ জিহাদী গ্রুপের সদস্য ছিল আল্লাহর দল।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবির সিরিজ বোমা হামলার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক মতিন মেহেদীকে ঝিনাইদহর একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের রায়ে তাঁকে জেএমবির নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১১ সালে কুড়িগ্রামের আরেকটি আদালত ১৭ আগস্ট বোমা হামলার দায়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

মতিন মেহেদীর সহপাঠী এবং গাইবান্ধা শহরের অধিবাসী সিদ্দিক আলম দয়াল বেনারকে বলেন, “১৯৭৯ সালে এসএসসি পাশের পর মতিন মেহেদীকে আর জনসমুখে দেখা যায়নি।”

তিনি বলেন, “১৯৮৫ সালে গাইবান্ধা থেকে আল্লাহর দলের ২৫ সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তখনই আমরা আল্লাহর দলের ব্যাপারে জানতে পারি।”

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আল্লাহর দলের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর পুলিশ তাদের গতিবিধির ওপর নজর রেখেছে। উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের অনেক সদস্যকে নিয়মিত গ্রেপ্তার করছে পুলিশ।”

তিনি বলেন, “তাদের সদস্য সংখ্যা কত সেটি জানা যায়নি। তবে তারা হুমকি হতে পারে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।”

সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর মেহেরপুর জেলায় আল্লাহর দলের আট সদস্যকে আটক করে পুলিশ। এর আগে ২০১৮ সালে নভেম্বরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এই দলের আরো চার সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।

কেন নিষিদ্ধ?

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক একেএম শহিদুল হক বেনারকে বলেন, “২০০৪ সালের বোমাবাজির পর থেকে তারা তেমন কোনো সহিংস ঘটনা ঘটায়নি। সে কারণে সরকার হয়তো আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ করেনি।”

তিনি বলেন, “তবে দলটি নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। দল নিষিদ্ধ না করলে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা করা যায় না। তাছাড়া, নিষিদ্ধ করলে সাধারণ মানুষ তাদের সদস্য হতে চাইবে না।”

তাঁর মতে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ না করলে তাদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করাই শেষ কথা নয়। তারা যাতে বিস্তার করতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাহেদুল আনাম খান বেনারকে বলেন, “জঙ্গি সংগঠন শুধু নিষিদ্ধ করলেই হবে না। তারা যাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তার ঘটাতে না পারে তার জন্য ডির‌্যাডিকালাইজেশন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।”

“পুলিশ-র‌্যাবের নজরদারি জেএমবি, নব্য-জেএমবি, আনসার আল ইসলামের দিকে বেশি। এই সুযোগে তারা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে,” মন্তব্য করে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “পুরোনো জেএমবির শূন্যস্থান হয়তো আল্লাহর দল নেয়ার চেষ্টা করছে।”

তাঁর মতে, “আরও আগে আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত ছিল। এখন তাদের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সরকারের চিন্তা করা উচিত ছিল।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন