Follow us

কওমিদের খতমে নবুয়ত মহাসম্মেলন ঘিরে আতঙ্কে আহমদিয়া সম্প্রদায়

শরীফ খিয়াম
2018-04-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার বকশীবাজারে বাংলাদেশ আহমদিয়া মুসলিম জামাতের প্রধান মসজিদ। ৫ এপ্রিল ২০১৮।
ঢাকার বকশীবাজারে বাংলাদেশ আহমদিয়া মুসলিম জামাতের প্রধান মসজিদ। ৫ এপ্রিল ২০১৮।
মনিরুল আলম/বেনারনিউজ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে কওমি উলামা পরিষদের ‘খতমে নবুয়ত মহাসম্মেলন’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

গত চার মাস ধরে ওই এলাকায় কাদিয়ানি বা আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে জোরালো ‘হেইট ক্যাম্পেইন’ চালানো হচ্ছে জানিয়ে তাঁরা বলছেন আহমদিয়া জামা’ত অনুসারীদের নিষিদ্ধ এবং সরকারিভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করার দাবিতেই এ সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।

“ওই মহাসম্মেলন থেকে আমদিয়াদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে উসকে লেলিয়ে দেওয়া হতে পারে,” বেনারকে বলেন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নাসিরপুর মসজিদের ইমাম শামছুদ্দীন আহমেদ মাসুম।

তিনি বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় আমাদের ১৬টি মসজিদ আছে। এইগুলোর চারপাশের গ্রামে নভেম্বর থেকে গত চার মাসে কমপক্ষে দু শ’ মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে শুধু আমাদের গালি দিতে।”

এদিকে গত দুই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একাধিক আহমদিয়া পরিবার আক্রান্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

“একই দিনে তিনটা বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে মোল্লারা” জানিয়ে ইমাম মাসুম বলেন, “মৌলবাদী গোষ্ঠী এলাকার সবাইকে সকাল-বিকেল বলছে কাদিয়ানিরা কাফের।”

লিখিত অনুমতি নেই

সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার জন্য বহুল আলোচিত নাসিরনগরের উপজেলা হেলিপ্যাড মাঠে আগামী ২০ এপ্রিল ‘খতমে নবুয়ত মহাসম্মেলন’ করার অনুমতি পাওয়া গেছে বলে বেনারকে জানান নাসিরনগর কওমি উলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন।

“জেলা প্রশাসক আগামী ২০ এপ্রিল আমাদের সম্মেলন করার অনুমতি দিয়েছেন,” বৃহস্পতিবার বেনারের কাছে দাবি করেন তিনি।

যদিও এমন অনুমতির খবর জানা নেই বলে জানিয়েছেন নাসিরনগরের কর্মকর্তারা।

এদিকে “লিখিত নয় তারা মৌখিকভাবে অনুমতি পেয়েছে,” বলে বেনারকে জানান আহমদিয়া ইমাম মাসুম।

এই সম্মেলন গত পয়লা এপ্রিল হওয়ার কথা ছিল। এর প্রচারণা চলাকালে গত ২৭ মার্চ স্থানীয় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাঁদের ঘরবাড়ি ও মসজিদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা চেয়ে নাসিরনগরের ইউএনও বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়।

তবে সেসময় সম্মেলনের অনুমতি মেলেনি। পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান।

এবার প্রশাসনের অনুমতি মিলেছে জানিয়ে কওমি নেতা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন বেনারকে বলেন, “জেলা প্রশাসকের সাথে বৈঠকে বসেছিলাম আমরা। ডিসি মৌখিক অনুমতি দিয়ে বলেছেন একটা দরখাস্তও দিয়ে যান।”

পরদিন জেলা প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত দেওয়ার কথাও বলেন শামছুদ্দীন।

“আমার জানা মতে তারা অনুমতি পায়নি। তবে আবার আবেদন করেছে,” বেনারকে বলেন নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওসি আবু জাফর।

“অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা জানা নেই,” মন্তব্য করেন নাসিরনগরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালমা।

আতঙ্কে আহমদিয়ারা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের এক যুবকের ছবি প্রকাশ করার গুজবে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর এই নাসিরনগরে অজস্র ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

“ওই ঘটনায় হিন্দুদের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন, আহমদিয়া বিরোধী এই আয়োজনের নেপথ্যেও তাদের হাত রয়েছে,” বলেন ইমাম মাসুম।

“ডিসি মহোদয় লিখিত অনুমতি কেন দিলেন না। এই জায়গাতেই সন্দেহ,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ডিসি মহোদয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এমন কিছু হবে না, যাতে আমরা কোণঠাসা হয়ে যাই।”

ইমাম মাসুম জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলায় কমপক্ষে ২০-৪০ হাজার আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ আছে। আর কওমি মাদ্রাসার ছাত্র আছে কমপক্ষে দুই লাখ।

“অনুমতি পেয়ে ওরা হাজার হাজার মাদ্রাসার ছাত্রকে একত্র করবে। এরপর তারা হাঙ্গামা করলে পুলিশ সামাল দিতে পারবে না,” বেনারকে বলেন আহমদিয়া জামা’ত এর আমির মোবাশশেরউর রহমান।

তবে আহমদিয়াদের শঙ্কার কথা কিছু জানেন না দাবি করে মহাসম্মেলনের আয়োজক নাসিরনগর কওমি উলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন বলেন, “তাদের যদি কোনো দুর্বলতা থাকে, তবে তাদের আশঙ্কা’তো থাকতেই পারে।”

“আমরা খতমে নবুয়তের মাহফিল করব। এতে অন্য কার কী হবে না হবে তা আমরা জানিও না। আমরা শুধু মাহফিল করতে চাই,” বলেন তিনি।

এদিকে নাসিরনগরের ওসি বেনারকে বলেন, “কাদিয়ানিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ নজরদারি আছে। খতমে নবুয়্যত সম্মেলন হলে অবশ্যই তা আরও জোরদার করা হবে।

গোয়েন্দারা আহমদিয়াদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করছেন জানিয়ে ইমাম মাসুম বলেন, “কিন্তু তারা যে জায়গা চিনছেন বা দেখে যাচ্ছেন, সেখানেই আমরা আক্রান্ত হচ্ছি।”

তিনি বলেন, “হিন্দুদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনার পর থেকে ‘সেনসিটিভ’ হয়ে থাকা নাসিরনগরের মতো জায়গা নিয়ে সরকার কীভাবে আবার একই রকম গেম খেলছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।”

“যেহেতু এ দেশে ভোটের রাজনীতি মুখ্য, এখন সরকারের সামনে একটু লাফঝাফ না করলে কীভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে আহমদিয়া বিরোধী ইস্যু একটি সহজপন্থা। আমরা মৌলবাদীদের সবচেয়ে ‘ইজি টার্গেড’,” বেনারকে বলেন আহমদিয়া জামাতের মোবাল্লেগ ইনচার্জ আব্দুল আউয়াল খান চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন