হিন্দুদের ওপর হামলায় বাহিনীর গাফিলতি পেয়েছে পুলিশের তদন্ত কমিটি

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.11.15
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
রাজধানীর শাহবাগে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। নভেম্বর ১৫, ২০১৬। রাজধানীর শাহবাগে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। নভেম্বর ১৫, ২০১৬।
নিউজরুম ফটো

ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের অবহেলা ছিল না বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তবে ঘটনা তদন্তে পুলিশের গঠিত কমিটিই আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতি পেয়েছে।

ঘটনার পর জেলা পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটি মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

জানতে চাইলে কমিটির প্রধান ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, হামলার পেছনে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বন্দ্ব বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এ বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে পুলিশের অবহেলার প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঘটনার আগে থেকেই ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলেও পুলিশ তথ্য সংগ্রহ এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।  শাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে তদন্তকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। কমিটি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছে। মোট ১৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ২২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের তদন্তে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলার বিষয়টি উঠে আসলেও গত ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো গ্যাপ ছিল কি না, দেখা হচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, পুলিশ বাহিনী বা ওই কর্মকর্তার (ওসি) কোনো গ্যাপ ছিল না। তারা আরও তৎপর থাকতে পারত। এ জন্যই ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।”

গত ৩০ অক্টোবর একদল দুর্বৃত্ত নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। ২৮ অক্টোবর নাসিরনগরে জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাসের ফেইস বুক পাতায় একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পাঁচ দিন পর ৪ নভেম্বর ওই এলাকায় কয়েকটি বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে যখন সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় চলছে তখন ১২ নভেম্বর আগুন দেওয়া হয় আরেকটি হিন্দু বাড়িতে। এসব ঘটনায় মোট ছয়টি মামলা হয়েছে নাসিরনগর থানায়।

গ্রেপ্তার মোট ৮৪ জন

হিন্দুদের বাড়িঘর এবং মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় মোট ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হামলার ভিডিও দেখে সোমবার মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বশেষ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।  নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু জাফর বেনারকে বলেন, হামলার ভিডিও দেখে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। দুই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে এ পর্যন্ত মোট ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নাসিরনগর অভিমুখে লংমার্চ

নাসিরনগরসহ সারা দেশে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ থেকে নাসিরনগর অভিমুখে লংমার্চ করার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ছয় দফা দাবিতে মঙ্গলবার শাহবাগে আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করেন তাঁরা। এরপর শিক্ষার্থীদের কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে লংমার্চের ঘোষণা দিয়ে তাঁরা অবরোধ তুলে নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ, সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ, মাইনরিটি রাইটস মুভমেন্টের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা এই লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত তাঁরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে অবস্থান নেন। কর্মসূচি থেকে সাম্প্রদায়িক রক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের অপসারণ দাবি করা হয়। যদিও ছায়েদুল হক সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তিনি সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেননি।

শাহবাগ মোড়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ। নভেম্বর ১৫, ২০১৬।
শাহবাগ মোড়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ। নভেম্বর ১৫, ২০১৬।
নিউজরুম ফটো।

বেলা সোয়া একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ঘটনাস্থলে যান। এ সময় তিনি বলেন, অপরাধীরা যে দল বা মতেরই হোক না কেন তাদের বিচার করতে হবে। তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের হামলা খুবই ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক। উপাচার্যের বক্তব্যের পর দুপুরের দিকে আন্দোলনের সমন্বয়ক মানিক রক্ষিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আগামী শুক্রবার সকাল আটটায় শাহবাগ থেকে নাসিরনগরে লংমার্চ করা হবে। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা বলেন।

জড়িতদের ধরিয়ে দিলে পুরস্কার

নাসিরনগরে হিন্দুপাড়ায় দুই দফা আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের ধরিয়ে দিলে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। গত সোমবার পুলিশ এ ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নাসিরনগর সদর এবং এর আশপাশ এলাকায় পুরস্কারের বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে বলা হয়, যারা তথ্য দেবেন তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। ০১৭১৩৩৭৩৭২৪, ০১৭১৩৩৭৩৭২৫, ০১৭১৩৩৭৩৭২৭ ও ০১৭১৩৩৭৩৭৩৩ নম্বরে যোগাযোগ করে তথ্য দিতে আহ্বান জানানো হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আবদুল করিম বেনারকে বলেন, “হিন্দুদের বাড়িতে হামলার পর পরিত্যক্ত রান্নাঘর ও গোয়ালঘরে যারা আগুন দিয়েছে তাদের ধরিয়ে দিতে বা তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। তথ্যদাতার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।”

ব্রিটিশ এমপির উদ্বেগ

সংখ্যালঘু মানুষের ওপর হামলা ও বাড়িঘর লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হিন্দুবিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির প্রধান বব ব্ল্যাকমেন। তিনি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমপি। এক বিবৃতিতে বব ব্ল্যাকমেন বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কয়েক মাস ধরে হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনা গভীর হতাশার ও দুঃখজনক। নিজ দেশেই মানুষগুলো নিজেদের জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। এটাও গভীর উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার বিষয়। বিবৃতিতে ব্ল্যাকমেন সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।