Follow us

খ্রিস্টান যাজকদের ই-মেইল বার্তায় হুমকি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-12-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সিলেট থেকে উদ্ধারের পর পুলিশের গাড়িতে ফাদার ওয়াল্টার রোজারিও। ০১ ডিসেম্বর ২০১৭।
সিলেট থেকে উদ্ধারের পর পুলিশের গাড়িতে ফাদার ওয়াল্টার রোজারিও। ০১ ডিসেম্বর ২০১৭।
বেনারনিউজ

নাটোরের বনপাড়া থেকে এক খ্রিস্টান ধর্মযাজক নিখোঁজ হবার পরেরদিন আরো কয়েকজন যাজককে হুমকি দিয়ে ই-মেইল করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি তাঁরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালেও বাংলাদেশে পোপের সফরের কথা মাথায় রেখে গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেননি।

বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও বেনারকে বলেন, “পোপের সফরের দুই দিন আগে আমাদের কয়েকজন ফাদারের কাছে ই-মেইলে পাঠিয়ে বলে ‘তোরা পোপের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করছিস! তোদের নিজের নিরাপত্তা কে দেবে?”

নির্মল বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে পুলিশ-র‌্যাবকে জানাই। তবে, পোপের সফরের কথা মাথায় রেখে ই-মেইলটির ব্যাপারে সাংবাদিকদের কিছু জানাইনি।”

তিনি বলেন, “সেই ই-মেইলটি কারা পাঠিয়ে ছিল সে ব্যাপারে আমরা এখনো কিছু জানি না।”

ফাদারের অপহরণ নিয়ে রহস্য

অপহরণের চার দিন পর সিলেট থেকে ফাদার ওয়াল্টার রোজারিওকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও পুরো ঘটনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।

পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ সফরের আগে নভেম্বরের ২৭ তারিখে নাটোরের বনপাড়া থেকে হঠাৎ তিনি নিখোঁজ হয়ে যান বলে তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।

এদিকে তাঁকে উদ্ধারের পর পুলিশ বলছে, ফাদার রোজারিওকে কেউ অপহরণ করেনি। বরং তিনি নিজে চাপ ও হতাশা থেকে রক্ষা পেতে আত্মগোপনে চলে যান।

অন্যদিকে খ্রিস্টান নেতৃবৃন্দ বলছেন, তিনি অপহৃত হয়েছিলেন।

“উনাকে কেউ অপহরণ করেনি। উনি ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন বলে ওনার সঙ্গে কথা বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তাই মানসিক চাপ থেকে রক্ষা পেতে উনি নিজেই আত্মগোপনে যান। আমরা তাঁকে উদ্ধারের পর তার ভাইয়ের জিম্মায় দিয়ে দিয়েছি,” বেনারকে বলেন নাটোরের পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার।

অপহরণের যে দাবি করা হয় তা ‘মিথ্যা’ বলে জানান তালুকদার।

তবে আত্মগোপন করার জন্য ফাদার ওয়াল্টারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

“আমার ভাই বর্তমানে রাজশাহীতে চার্চের হেফাজতে রয়েছেন। উনি অপহৃত হয়েছেন কি না, উনি কীভাবে সিলেট গেলেন- তার কাছে এসব কিছুই জানতে চাইনি। উনি সুস্থ ও অক্ষতভাবে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন এটাই বড় কথা,” বেনারকে বলেন ফাদার ওয়াল্টারের ভাই অমল রোজারিও।

তবে জঙ্গিরা তাঁকে অপহরণ করেনি বলে জানান অমল।

“জঙ্গিরা তাকে নিলে অন্যরকম কিছু হতে পারত। তাই জঙ্গিরা তাকে অপহরণ করেনি,” বেনারকে বলেন নির্মল রোজারিও।

তিনি বলেন, “একজন ফাদার অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে এই পর্যায়ে আসে। উনি একজন শিক্ষক। উনি কেন মিথ্যা কথা বলবেন? আমরা মনে করি এটি একটি অপহরণের ঘটনা।”

ফাদার ওয়াল্টার বর্তমানে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলছেন না বলেও জানান নির্মল।

“উনি নিখোঁজ হওয়ার পর একটি মোবাইল নম্বর থেকে তার পরিবারের কাছে কল করে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। এরপর আর তাদের পাওয়া যায়নি,” বলেন নির্মল রোজারিও।

অপহরণকারীরা তাকে তুলে নিয়ে কয়েকটি জায়গায় আটকে রাখে বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, পয়লা ডিসেম্বর ফাদার ওয়াল্টার ফাঁক পেয়ে অপহরণকারীদের কাছ থেকে পালাতে সক্ষম হন। তিনি পালিয়ে সিলেটে শ্যামলী বাস কাউন্টারে যান। সেখান থেকে তিনি তাঁর পরিবারের কাছে ফোন করেন।

তাঁর পরিবারের সদস্যরা নাটোর পুলিশকে ঘটনাটি জানালে সিলেট পুলিশের একটি দল তাঁকে তাদের হেফাজতে নেয়।

নাটোরের সেন্ট লুইস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াল্টার রোজারিও পোপের সফর উপলক্ষে ঢাকায় আগমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ নিখোঁজ

গত ৪ ডিসেম্বর মারুফ জামান বেলজিয়াম থেকে আসা মেয়েকে তুলতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। ওই দিন রাত পৌনে ৮ টার পর থেকে মারুফ জামানের ফোন বন্ধ। পুলিশ বলেছে, তাঁর সবশেষ অবস্থান ছিল বিমানবন্দরের কাছে দক্ষিণখানের কাওলায়। তাঁর গাড়িটি গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত তিনশ ফিট এলাকায় পার্ক করা ছিল।

গতকাল বুধবার মারুফ জামানের মেয়ে সামিহা জামান বেনারকে বলেন, “বাবা বাসা থেকে বের হওয়ার পর দু’বার ফোন করেন। ফোন ধরেছিল গৃহপরিচারিকা। পৌনে আটটার দিকে একবার হ্যালো হ্যালো করে রেখে দিয়েছেন। পরের বার বলেছেন, কয়েকজন লোক যাবে তাঁদের যেন ল্যাপটপ, বাসার কম্পিউটারের সিপিইউ, ক্যামেরা ও স্মার্টফোন দিয়ে দেওয়া হয়।”

সামিহা আরও বলেন, রাত ৮টার দিকে তিনজন লোক এসে সবকিছু নিয়ে যায়। তারা বাড়িতে তল্লাশিও চালায়।

মারুফ জামান ১৯৭৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। শারীরিক সমস্যার জন্য ১৯৮২ সালে তিনি ‘মেডিকেল রিটায়ারমেন্ট’ নেন।

ওই একই বছর তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দিয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তিনি দেশের বাইরে। তিনি কাতার ও ভিয়েতনামে রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

২০০৯ সালে তিনি দেশে এসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে যোগ দেন। চার বছর পর অবসরে যান।

মারুফ জামানকে উদ্ধারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ কাজ শুরু করেছে বলে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার রেশ না কাটতেই হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্ত হলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রাপ্তি রহমান

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন